প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিলেট নগরীর রিকাবীবাজার এলাকা থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলার আসামি এবং নিষিদ্ধঘোষিত পলাতক ছাত্রলীগ ক্যাডারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কোতোয়ালী মডেল থানার আওতাধীন লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আলী খানের নেতৃত্বে বিশেষ অভিযানে তাকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতের নাম রাজিক খান (১৯)। তিনি সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং নগরীর পাঠানটুলা আমীর খান রোড এলাকার বাসিন্দা। তার পিতা মো. রিয়াজ খান।
পুলিশের সূত্রে জানা গেছে, রাজিক দীর্ঘদিন ধরে সিলেট নগরীতে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ছাড়াও একাধিক মামলার অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে আত্মগোপনে ছিল সে। পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়েও তাকে ধরতে সক্ষম হয়নি। অবশেষে সোমবার সন্ধ্যায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রিকাবীবাজার এলাকায় অবস্থানকালে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে কোতোয়ালী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এসআই আলী খান জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত রাজিকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে আদালতে সোপর্দ করা হবে। প্রাথমিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের ধারণা, তার কাছ থেকে নগরীর অন্যান্য অপরাধচক্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় বিভিন্ন গ্রুপের তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
রাজিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নতুন নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী মহলে প্রভাব খাটাতেন। নগরীর বিভিন্ন স্থানে দলীয় কর্মসূচি চলাকালে তার নেতৃত্বাধীন গ্রুপ ভীতি প্রদর্শন এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামার জন্য পরিচিত ছিল। এর আগেও বেশ কয়েকবার তাকে গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছিল, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সে সময় বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
সিলেটে ছাত্র রাজনীতির নাম করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় অনেকেই ছাত্র রাজনীতিকে ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থে। এর ফলে প্রকৃত ছাত্র নেতৃত্ব যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষ ভোগ করছে চরম ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতায়। রাজিকের মতো অনেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সুরক্ষা পেয়ে আসছিল।
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃত রাজিক নিষিদ্ধঘোষিত একটি গোষ্ঠীর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখত। সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় তার নাম আসার পর থেকেই সে পলাতক ছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড। এ কারণেই বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সমাজকর্মীরা এ ঘটনায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা যখন দায়মুক্তি পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ ভোগ করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়ে। এ ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হলে সমাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সহজ হয় এবং জনগণের আস্থা ফেরে।
অন্যদিকে, ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, ছাত্র রাজনীতির নামে যারা অপরাধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ ছাত্র রাজনীতি দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, অথচ বর্তমান সময়ে এর সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে অপরাধীদের হাতে। তারা আশা করছেন, রাজিকের মতো অপরাধীদের বিচার হলে ছাত্র রাজনীতিকে পরিষ্কার করা সহজ হবে এবং প্রকৃত ছাত্রনেতারা নিজেদের ভূমিকা রাখতে পারবে।
রাজিকের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে সিলেট মহানগরজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজিকের প্রভাব এলাকায় ছিল এবং তার কারণে ছাত্রদের পড়াশোনা ও রাজনৈতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তার গ্রেপ্তারে তারা স্বস্তি বোধ করছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, রাজিককে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তার সহযোগী ও চক্রের অন্যান্য সদস্যদেরও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তারা বলছে, এ ধরনের ক্যাডারদের গ্রেপ্তার শুধু অপরাধ দমন নয়, বরং রাজনৈতিক অঙ্গনের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
অপরাধ দমনে পুলিশের এ ধরনের তৎপরতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে সিলেটসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে বলে আশা করছে সাধারণ মানুষ। তবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। তাই নাগরিক সমাজের দাবি, আইনের শাসন যেন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় কোনো অপরাধী যাতে দায়মুক্তি না পায়।
অবশেষে বলা যায়, নিষিদ্ধঘোষিত পলাতক ছাত্রলীগ ক্যাডার রাজিকের গ্রেপ্তার কেবল একটি অপরাধ দমনের ঘটনা নয়; বরং এটি ছাত্র রাজনীতিকে অপরাধমুক্ত করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন দেখা বাকি, আদালতে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয় এবং এর মাধ্যমে সিলেটে রাজনৈতিক সন্ত্রাস কতটা দমন করা যায়। জনগণের প্রত্যাশা—এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু একদিনের জন্য নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে চলুক এবং অপরাধীরা যেই হোক না কেন, সবাই আইনের আওতায় আসুক।