রাকসু নির্বাচন: ক্যাম্পাসের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে শহরজুড়ে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৬ বার
রাকসু নির্বাচন: ক্যাম্পাসের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে শহরজুড়ে

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের ঘোষণার পর থেকেই জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। প্রায় ৩৫ বছর পর আগামী ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত এই ভোটযুদ্ধ। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত দুটি শক্তি হলো ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির। মূল লড়াইও এই দুটি সংগঠনের সমর্থিত প্যানেল প্রার্থীদের মধ্যে হবে। ফলে বিষয়টি কেবল ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাধারণ মানুষের মাঝে, দেশের রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

রাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে ছাত্ররাজনীতি। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষও উৎসাহ নিয়ে নির্বাচনের খুঁটিনাটি বিষয় বিশ্লেষণ করছেন। কে কোন প্যানেলে ভিপি বা জিএস পদে দাঁড়াচ্ছেন তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে শহরের চায়ের দোকান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন রাকসু।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সেই কারণে তরুণদের অনেকেই দেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তবে জুলাই বিপ্লবের পর নতুনভাবে ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে।

সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এবারের রাকসু নির্বাচন শুধু ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, গণতান্ত্রিক চর্চার এই মহড়া হবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক। তাই রাজশাহীর মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন নির্বাচনের ফলাফলের জন্য।

ডাকসু ও জাকসুর সাম্প্রতিক ব্যর্থতার পর ছাত্রদল রাকসুতে বিজয়ের প্রত্যাশায় মাঠে নেমেছে। ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক শিক্ষার্থী ও নেতাকর্মীরা মূল দলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রচারণার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এবারের নির্বাচনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, বাম ছাত্র সংগঠনসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন নিজ নিজ প্যানেলে অংশ নিচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। প্রতিটি দল নিজস্ব জরিপ ও কৌশল নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে।

‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ নামের বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল দিয়ে ছাত্রশিবির প্রথম থেকেই চমক দেখিয়েছে। তারা ক্যাম্পাসে এবং সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছে।

ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর বলেন, “ডাকসু বা জাকসুর সঙ্গে রাকসুর তুলনা করা যথাযথ হবে না। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আচরণ ও প্রত্যাশাও অনন্য। তাই রাকসুর নির্বাচনকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।”

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “ডাকসু ও জাকসুতে শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রতি যে আস্থা রেখেছেন, সেটি আসলে শিক্ষার্থীদের পরিবর্তন চাওয়ার বার্তা। আমরা চাই, এবারের নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে এবং স্বচ্ছ নেতৃত্ব বেছে নেবে।”

রাজশাহী মহানগরীর আলুপট্টি এলাকার চায়ের দোকানে আলাপকালে রফিকুল ইসলাম বলেন, “অনেক দিন পর রাকসু নির্বাচন হচ্ছে। এতে ছাত্ররা আবার গণতান্ত্রিক চর্চায় ফিরবে।” তবে, এক দিনমজুর জয়নাল আবেদীন প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, “ভোট দিলে কি ছাত্রদের সমস্যা আসলেই কমবে, নাকি আগের মতো গোলমাল আবার শুরু হবে?”

এক তরুণ ব্যবসায়ী শিহাব উদ্দিন মন্তব্য করেন, “যদি যোগ্য ও সৎ ছাত্ররা নির্বাচিত হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত হবে। তার সুফল বাইরের মানুষও পাব।” মেহেরচণ্ডি এলাকার প্রবীণ নাগরিক সেফাতুল্লাহ জানান, “দলীয় প্রভাব বেশি থাকলেও শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নিশ্চিত হওয়া জরুরি। নির্বাচন যদি নিরপেক্ষ হয়, তবে ফলও ভালো হবে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন ফিরোজ বলেন, “ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হার-জিত কেবল ব্যক্তিগত বা দলীয় বিষয় নয়। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যই ইজ্জতের লড়াই। বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও আশঙ্কা দুটোই দেখা যাচ্ছে। রাকসু নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব ভবিষ্যৎ রাজনীতিতেও পড়তে পারে।”

বিশেষ করে ডাকসু ও জাকসুর ব্যর্থতার পর রাকসু নির্বাচন নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করছে। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, নির্বাচিত নেতৃত্ব শুধু দলীয় স্বার্থ নয়, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা যেমন আবাসন, যাতায়াত, শিক্ষার মান ও ক্যাম্পাসের পরিবেশের উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেবে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, ভোটাররা রাকসু নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণের প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ভোটাররা চাইছেন যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের দাবী ও প্রত্যাশা প্রকাশ করতে পারবেন। ক্যাম্পাসের বাইরেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, রাকসু নির্বাচন শুধু পদপদবী নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যা ভবিষ্যতের নেতৃত্ব ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করবে। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, ভোটাধিকার সচেতনভাবে প্রয়োগ করলে ক্যাম্পাসের পরিবেশ উন্নত হবে এবং রাজনীতির মধ্যে তরুণদের অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা পাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করছেন, এবারের রাকসু নির্বাচনের ফলাফল কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্ররাজনীতির ধারা প্রভাবিত করবে। ছাত্ররাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির সংযোগ এবার প্রমাণিত হবে, কারণ নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব বহিঃপ্রকাশ করবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মকৌশল ও ছাত্র নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে।

এভাবে রাকসু নির্বাচন কেবল ক্যাম্পাসের বিষয় না থেকে পুরো রাজশাহী ও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে। ১৬ অক্টোবরের ভোটযুদ্ধ শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলে এটি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত