প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটভিত্তিক সমীকরণ সবসময়ই সংবেদনশীল ও বিতর্কিত ইস্যু। বিশেষত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। তিনি দাবি করেন, জামায়াতে ইসলামী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কাছে ৩০টি আসন চেয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সেই দাবি মেনে না নেওয়ায় জামায়াত এখন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর ব্যবস্থার দাবি তুলছে, যা বিএনপির ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল।
মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এই অভিযোগকে ‘অসত্য, অমর্যাদাকর ও প্রতিহিংসাপরায়ণ’ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানান। তিনি বলেন, “সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘এই সময়’ পত্রিকার সাথে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছেন, তা সম্পূর্ণ মনগড়া এবং ভিত্তিহীন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো অভিজ্ঞ ও প্রবীণ রাজনীতিক এ ধরনের বক্তব্য দেবেন— তা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে যদি তিনি সত্যিই এমন কিছু বলে থাকেন, তাহলে জামায়াত দৃঢ়ভাবে তার প্রতিবাদ জানাচ্ছে।”
অধ্যাপক পরওয়ার আরও বলেন, “আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, জামায়াতে ইসলামী বিএনপির কাছে কোনো আসন ভাগাভাগির দাবি করেনি। যদি সত্যিই তিনি মনে করেন যে আমরা ৩০টি আসন দাবি করেছি, তবে তিনি যেন সেই প্রমাণ জাতির সামনে উপস্থাপন করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।”
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক এই সময়-এর সাংবাদিক অনমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন। সোমবার প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “জামায়াতে ইসলামী আমাদের কাছে ৩০টি আসনে ছাড় চেয়েছিল। আমরা সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিইনি। এরপর থেকেই তারা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার দাবি তুলছে এবং আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে।”
এই বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক ঘিরে যে টানাপোড়েন চলছিল, ফখরুলের মন্তব্য এবং জামায়াতের প্রতিবাদ সেই দ্বন্দ্বকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এল।
জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির অন্যতম রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে। তবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চাপে ২০১৪ সালের পর থেকে বিএনপি প্রকাশ্যে জামায়াতকে তাদের রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকে। আদালতের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবুও বিএনপির আন্দোলন ও কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে জামায়াতপন্থী নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি প্রায়শই লক্ষ্য করা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কারণ, এককভাবে সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার মতো সংগঠন ও কাঠামোগত সক্ষমতা বিএনপির নেই বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে জামায়াতও তাদের নিবন্ধন বাতিল হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে একটি উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক ধরে রেখেছে। এ কারণে আসন ভাগাভাগির প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
তবে ফখরুলের বক্তব্য ও জামায়াতের প্রতিবাদে স্পষ্ট হয়েছে যে দুই দলের মধ্যে আস্থার সংকট এখনো বিদ্যমান। বিএনপি মহাসচিব যখন বলেন জামায়াত চাপ সৃষ্টি করছে, তখন জামায়াত সেটিকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং মিথ্যা আখ্যা দিয়ে তা অস্বীকার করছে। এই অবস্থায় উভয় দলের সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে এবং জোটভিত্তিক কৌশল দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেই বলছেন, বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক এখন মূলত কৌশলগত এবং প্রয়োজনভিত্তিক। দুই দলের আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তারা অনেক সময় একত্রিত হয়েছে। তবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে আসন ভাগাভাগির মতো বিষয়গুলোতে সমঝোতায় পৌঁছানো সবসময়ই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা এসেছে যে তারা কোনো আসন ভাগাভাগির দাবি করেনি। বরং তারা দাবি করছে, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা নিয়ে বিএনপি মহাসচিব অযথা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার তার বিবৃতিতে আরও বলেন, “জামায়াত আন্দোলন-সংগ্রামে সবসময় সক্রিয় থেকেছে। আমাদের ভূমিকা অবমূল্যায়ন করার জন্য মিথ্যা বক্তব্য দেওয়া হলে আমরা তা মেনে নেব না। রাজনীতিতে সম্মান বজায় রাখা সবার দায়িত্ব।”
এখন দেখার বিষয় হলো, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতের এই প্রতিবাদের জবাবে কোনো ব্যাখ্যা দেন কি না। কারণ, নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিটি পদক্ষেপই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একটি ভুল মন্তব্য বা ভিত্তিহীন অভিযোগ সহযোগী দলের সঙ্গে সম্পর্কের ফাটল গভীর করতে পারে, যার প্রভাব ভোটের ফলাফলেও পড়তে পারে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে আস্থার সংকট যে বেড়েছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আগামী দিনগুলোতে যদি দুই দলই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি দায়বদ্ধ থাকে এবং বিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ থাকতে চায়, তবে পারস্পরিক দোষারোপের পরিবর্তে গঠনমূলক সংলাপে যেতে হবে। অন্যথায় বিরোধী জোটের রাজনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের জন্যই সুবিধাজনক হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটভিত্তিক সমীকরণ সবসময় অঙ্কের মতো জটিল। মির্জা ফখরুলের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং জামায়াতের প্রতিবাদ এই অঙ্ককে আরও জটিল করে তুলল। এখন অপেক্ষা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোন দিকে মোড় নেয় এবং বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়ায় তা দেখার।