প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নিউ ইয়র্কের জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সফরসঙ্গী ছিলেন দেশের শীর্ষ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা। ঠিক সেই মুহূর্তে সংগঠিত হয় নজিরবিহীন এক তাণ্ডব, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার নগ্ন চেহারা উন্মোচন করেছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে এই হামলার আয়োজন করে এবং তা কার্যকর করে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে স্থানীয় সময় সোমবার বিকাল তিনটা থেকে চারটার মধ্যে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিমানবন্দর থেকে প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বের হওয়ার সময় একদল আওয়ামী লীগ সমর্থক আচমকা হামলা চালায়। তারা প্রথমে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আখতার হোসেনকে লক্ষ্য করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে এবং পরে আখতারকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করে। এমনকি হামলাকারীরা গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ে বাধা সৃষ্টি করে এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা ঠেকানো যায়নি।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে থাকা পাঁচজন রাজনৈতিক নেতার মধ্যে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া ক্যাডাররা নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ করছিলেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের দিক থেকেই নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল।
প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগেই নিউ ইয়র্কে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা তাদের প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। কয়েকদিন ধরেই তারা বিভিন্ন জায়গায় মহড়া চালায়। ফলে অনেকের কাছে এই হামলা ছিল পরিকল্পিত ও পূর্বঘোষিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন প্রকাশ্য সহিংসতা শুধু বাংলাদেশের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ণ করেনি, বরং প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
হামলার পর নিউ ইয়র্কে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘‘আমরা সেই প্রজন্ম, যারা হাসিনার গুলির সামনে দাঁড়িয়েছি। অতএব কয়েকটা ডিম ছোড়ায় আমাদের কিছু যায় আসে না। আওয়ামী লীগ জন্মগতভাবেই সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তারা সব সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই টিকে থাকার চেষ্টা করে।’’
অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘‘নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে যা ঘটেছে তা আবার প্রমাণ করল আওয়ামী লীগ তাদের অন্যায়ের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা করে না। আইনের মাধ্যমে তাদের সব অপরাধের বিচার হবেই।’’
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর নিউ ইয়র্ক পুলিশ হামলার সঙ্গে জড়িত যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানকে আটক করে। মিজান সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন। তার বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে আগেও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। হামলার দায় স্বীকার করে তিনি নিজের ফেসবুক পেজে একটি ভিডিওসহ লিখেছেন, ‘‘খাইয়া দিছি টেরোরিস্ট আকতারকে।’’ এই স্বীকারোক্তি ঘটনাটিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ঘটনার পর এনসিপি দাবি জানিয়েছে, রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী তৎপরতার ধারাবাহিকতা। তিনি নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলের পদত্যাগ দাবি করেন।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ঘটনাটিকে ‘‘বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক’’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘‘এটি নেগেটিভ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমেরিকার মতো গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।’’ তবে তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, এমন ঘটনা নতুন নয়, বরং বাংলাদেশ রাজনীতির দীর্ঘদিনের কুপ্রবণতার বহিঃপ্রকাশ।
ঘটনার সময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা মারুফ রহমান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে নিরাপদে গাড়িতে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার এই ভূমিকার কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। সাংবাদিক ইকবাল মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, ‘‘বিএনপির উচিত মারুফ রহমানকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া।’’
অন্তর্বর্তী সরকার ঘটনাটির জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে। সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘নিউ ইয়র্কে যা ঘটেছে, তা একটি নাজুক পরিস্থিতি। প্রধান উপদেষ্টা ও সফরসঙ্গী রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এ হামলা সম্ভবত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক শাসক শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের নির্দেশে সংঘটিত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চলছে।
বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের সমাবেশ যেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেই সময় নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রকাশ্য সহিংসতা আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্ন তুলেছে। অনেকেই বলছেন, এটি প্রমাণ করে বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো ঘৃণা, প্রতিহিংসা ও সহিংসতাপূর্ণ সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারেনি। জাতিসংঘ অধিবেশনের মতো কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নিউ ইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা কেবল একটি দলীয় হামলা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। দেশ ও বিদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশকে যে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, তা এ ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল। অন্তর্বর্তী সরকারের আশ্বাস সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থেকে গেছে—বাংলাদেশ কি আদৌ রাজনৈতিক সহিংসতা মুক্ত নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারবে, নাকি পুরনো সহিংস রাজনীতির অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকবে?