গাজায় শান্তির আশায়, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৫ বার
ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয়ের অবসান ঘটাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নতুন মোড় নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই গাজায় একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় এই পদক্ষেপ গাজার পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে বড় ভূমিকা রাখবে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে বলেন, “গাজার পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই সেখানে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, “গাজার বিষয়ে এখন খুব বেশি কিছু শোনা যাচ্ছে না, কারণ অনেক দেশই স্বেচ্ছায় সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসছে। যদি হামাসের সঙ্গে কোনো সমস্যা হয়, শক্তিশালী দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করবে।”

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সক্রিয়তা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ইঙ্গিত এসেছে এমন এক সময়ে, যখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গাজায় অন্তবর্তীকালীন শাসন সংস্থা ও শান্তিরক্ষী বাহিনীর জন্য দুই বছর মেয়াদি ম্যান্ডেট অনুমোদনের বিষয়ে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন এখন গাজা সংকটে একটি “বহুপাক্ষিক শান্তি কাঠামো” গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের মধ্যে এ বিষয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে, তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে আশার সঞ্চার হয়েছে যে গাজার ধ্বংসস্তূপে হয়তো এবার একটি নতুন সূচনা হতে পারে।

গাজা উপত্যকা বর্তমানে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, অবরোধ এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে অঞ্চলটি এখন প্রায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে গাজায় নিহত হয়েছেন কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষ, যাদের বড় অংশই নারী ও শিশু। অবকাঠামো ধ্বংস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট, এবং চিকিৎসা সেবার অভাবে মানুষ বেঁচে থাকার লড়াই করছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় এখন এক নতুন ধরনের মানবিক বিপর্যয় চলছে। অনেক হাসপাতাল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জাতিসংঘ ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, যদি যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়িত না হয়, গাজা “বসবাসের অযোগ্য অঞ্চলে” পরিণত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব অনেকের কাছে আশার আলো হয়ে এসেছে। তবে এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত। কারণ, কে নেতৃত্ব দেবে, কীভাবে ম্যান্ডেট কার্যকর হবে, এবং কোন দেশের সেনারা এতে অংশ নেবে—এসব প্রশ্নের এখনো কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।

ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র গাজায় একটি “সীমিত আকারের” আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে, যার মূল লক্ষ্য হবে নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা। বাহিনীটি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে এবং ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি পক্ষের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করবে।

একজন মার্কিন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখন সময় এসেছে গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠনের পথে এগোনোর। আন্তর্জাতিক বাহিনী সেখানে গেলে অন্তত মানবিক সহায়তা পৌঁছানো সহজ হবে এবং নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করা সম্ভব হবে।”

তবে অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলছেন, গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী পাঠানো সহজ কাজ নয়। অঞ্চলটির জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা, হামাসের প্রভাব, এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি স্থানীয় সমর্থন না মেলে, তবে শান্তিরক্ষী বাহিনীও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. সামির আল-খালেদ এক বিবৃতিতে বলেন, “গাজায় শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের চিন্তা ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নের পথ কঠিন। হামাস যদি এটিকে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে, তাহলে তারা প্রতিরোধে নামবে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করবে।”

অন্যদিকে, ইসরায়েল এখনো এই প্রস্তাব নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে দেশটির নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, তারা এমন একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন করতে পারে, যদি তা ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, ফ্রান্স ও জাপানসহ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে গাজায় মানবিক সহায়তা জোরদার করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এসব দেশও সম্ভবত আন্তর্জাতিক বাহিনীতে অংশ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানবিক পরিস্থিতি যেখানে দিন দিন অবনতি হচ্ছে, সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা নতুন আশার বার্তা হতে পারে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য কেবল “কূটনৈতিক কৌশল”ও হতে পারে। তারা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এই প্রস্তাব দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অভাব থাকলে গাজায় পরিবর্তন আসবে না।

গাজা সিটির এক বাসিন্দা আহমেদ ইয়াসিন স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। যদি এবার সত্যিই আন্তর্জাতিক বাহিনী আসে এবং যুদ্ধ বন্ধ হয়, তবে হয়তো আমাদের সন্তানরা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।”

মানবিক সংকটে ক্লান্ত গাজার মানুষের কণ্ঠে এখন কেবল একটাই আহ্বান— শান্তি। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া তাদের আশা যেন আবার আলো দেখে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা সেই আশাকে কিছুটা হলেও জাগিয়ে তুলেছে।

তবে আন্তর্জাতিক মহল এখন অপেক্ষা করছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের দিকে, যেখানে সিদ্ধান্ত হবে— সত্যিই কি গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী যাবে, নাকি এটি থেকে যাবে কূটনৈতিক কাগজে কলমে।

গাজার আকাশে এখনও ধোঁয়ার রেখা, মাটিতে কান্না আর মৃত্যু, কিন্তু এক ফাঁকে যেন আবার জন্ম নিচ্ছে এক নতুন প্রত্যাশা— হয়তো এবার শান্তি আসবে, হয়তো এবার শিশুদের কান্না থামবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত