স্বর্ণে ভ্যাট কমছে, ভরিতে নির্ধারিত হবে ২৫০০ টাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ৪০ বার
স্বর্ণে ভ্যাট কমছে, ভরিতে নির্ধারিত হবে ২৫০০ টাকা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের স্বর্ণবাজারে ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির বার্তা আসতে পারে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে স্বর্ণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্ধারিত হারে ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ভরি স্বর্ণের ওপর ভ্যাট নির্ধারণ করা হতে পারে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এতে একদিকে যেমন ক্রেতাদের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমবে, অন্যদিকে সরকারও ভ্যাট আদায়ে আরও কার্যকর ফল পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট মানের এক ভরি স্বর্ণের দাম প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এই দামে স্বর্ণ কিনতে গেলে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। ফলে শুধু ভ্যাট বাবদ একজন ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ১১ হাজার ৪৫০ টাকা। অর্থাৎ, অলঙ্কারের মজুরি ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়েও শুধুমাত্র করের কারণে স্বর্ণ কেনার মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে ক্রমবর্ধমান দামের প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সেই বাস্তবতা থেকেই আগামী বাজেটে নির্দিষ্ট অঙ্কের ভ্যাট আরোপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে প্রতি ভরি স্বর্ণের ক্ষেত্রে ক্রেতারা প্রায় ৯ হাজার টাকার বেশি ভ্যাট সাশ্রয়ের সুযোগ পেতে পারেন।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, বর্তমান ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত নয়। তাদের মতে, স্বর্ণের দাম যত বাড়ছে, ভ্যাটের পরিমাণও সমানুপাতিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে। এর ফলে অনেকেই স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত থাকছেন কিংবা আনুষ্ঠানিক বাজারের বাইরে বিকল্প পথ খুঁজছেন।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বর্ণের বাজারে লেনদেনের পরিমাণ আগের তুলনায় কমে গেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ, যারা বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ কিনতেন, তারা এখন উচ্চমূল্য ও করের চাপে পিছিয়ে যাচ্ছেন। ফলে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈধভাবে ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে।

রাজস্ব খাত–সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত অঙ্কের ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করা হলে তা কর প্রশাসনের জন্যও সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ শতাংশভিত্তিক ভ্যাটের ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের ওঠানামার সঙ্গে করের পরিমাণ পরিবর্তিত হয় এবং অনেক সময় প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট থাকলে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ে এবং ক্রেতারাও আগেই তাদের ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট ধারণা পেয়ে যান।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, স্বর্ণের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে কর কাঠামো এমন হওয়া উচিত, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করবে এবং অন্যদিকে বাজারের স্বাভাবিক প্রবাহও বজায় রাখবে। অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে যদি বৈধ বাজার সংকুচিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশে স্বর্ণ কেবল অলঙ্কার হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হয়। বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পারিবারিক উপহার এবং ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। ফলে এর মূল্য ও কর কাঠামোর পরিবর্তন সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

অনেক ক্রেতার অভিযোগ, স্বর্ণ কেনার সময় মূল দাম ছাড়াও মজুরি, ভ্যাট এবং অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। ফলে তারা প্রায়ই নির্ধারিত বাজেটের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে সেই চাপ কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্বর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারাও মনে করছেন, প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারিত ভ্যাট চালু হলে বৈধ বাজারে লেনদেন বাড়বে। ক্রেতারা উৎসাহিত হবেন আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে স্বর্ণ কিনতে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং কর ফাঁকি কমাতেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তাদের ধারণা।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় বিষয়টি চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে। ফলে স্বর্ণপ্রেমী মানুষ, ব্যবসায়ী এবং রাজস্ব সংশ্লিষ্ট মহল এখন তাকিয়ে আছে আগামী বাজেট ঘোষণার দিকে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি প্রস্তাবিত এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা দেশের স্বর্ণবাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে ক্রেতারা যেমন আর্থিক স্বস্তি পাবেন, তেমনি সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হতে পারে। সামগ্রিকভাবে এটি স্বর্ণবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।

একদিকে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ধারিত হারে ভ্যাট আরোপের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য কতটা স্বস্তি বয়ে আনে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত