তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড ঘোষণা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ৪০ বার
তরুণদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের তরুণ সমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে বড় ধরনের উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী অর্থবছরে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই তহবিল থেকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন তরুণ উদ্যোক্তারা, যা দেশের উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার (৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের তৃতীয় দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দেশের যুবসমাজকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা এবং চাকরিনির্ভর মানসিকতার পরিবর্তে উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো উদ্যোক্তা সৃষ্টি। বাংলাদেশেও বিপুলসংখ্যক তরুণ রয়েছেন, যাদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু মূলধনের অভাবের কারণে তাদের অনেকেই নিজেদের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেন না। সেই বাধা দূর করতেই সরকার সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি জানান, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্টার্টআপ তহবিল, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য মোট ৪০০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি পৃথকভাবে ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ নামে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে তরুণরা নিজেদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ শুরু বা সম্প্রসারণ করতে পারবেন।

সংসদে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে যুব ঋণ বিতরণ কার্যক্রম ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে। সরকার কম সুদে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করছে। তার মতে, তরুণদের দক্ষতা, উদ্যম এবং সঠিক আর্থিক সহায়তার সমন্বয় ঘটানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।

তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই। তাই সরকার কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, শুধুমাত্র প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা নয়, বরং কর্মমুখী ও বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। এজন্য ভোকেশনাল স্কুলগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি তরুণদের স্কিল ডেভেলপমেন্টে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, উৎপাদন খাত এবং সৃজনশীল শিল্পে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তরুণদের জন্য বিদ্যমান ঋণ সুবিধার প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকেও সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে ৭ শতাংশ সুদে ৭ লাখ টাকা থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। নতুন স্টার্টআপ ফান্ড কার্যকর হলে এই সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংসদে আলোচনার সময় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের বিষয়েও সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কন্টেন্ট নির্মাতাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে এবং আগামী বাজেটে এই খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ফলে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল তরুণদের জন্যও সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলতে পারে।

অর্থমন্ত্রী সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে সরকার। একই সঙ্গে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ ১৭ হাজার কৃষককে ঋণ মওকুফের আওতায় আনা হয়েছে। এ জন্য সরকার ১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে।

এদিকে দেশের পুঁজিবাজার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশের ক্যাপিটাল মার্কেট বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেবে। তার মতে, শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা চালু করা সময়োপযোগী উদ্যোগ। বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বিকল্প পথ তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে তারা মনে করেন, শুধু তহবিল গঠনই যথেষ্ট নয়; ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং ব্যবসায়িক সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ৫০০ কোটি টাকার এই স্টার্টআপ ফান্ড দেশের তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চাকরির পেছনে না ছুটে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরির যে স্বপ্ন বহু তরুণ দীর্ঘদিন ধরে লালন করে আসছেন, সরকারের এই নতুন উদ্যোগ সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন অপেক্ষা শুধু এই ঘোষণার কার্যকর বাস্তবায়নের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত