জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ৮৫ বার
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন বাজেটকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজস্ব ‘ছায়া বাজেট প্রস্তাবনা’ প্রকাশ করেছে। মঙ্গলবার (৬ জুন) রাজধানীর মগবাজারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দলটির পক্ষ থেকে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার এই বিকল্প বাজেট উপস্থাপন করা হয়। এতে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা।

অনুষ্ঠানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন এবং দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তৃত বক্তব্য দেন। তার মতে, দেশের জনগণের স্বার্থে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক বাজেট কাঠামো প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

ছায়া বাজেট উপস্থাপনকালে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা নষ্ট হলে রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভাজন ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। তার ভাষায়, জনগণের রায়কে সম্মান না করলে রাজনৈতিক দলের ওপর মানুষের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, দেশের আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে। পাশাপাশি তিনি সমাজে অপরাধপ্রবণতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে অযোগ্য ব্যক্তিদের বসানো হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হয়।

জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, তাদের প্রস্তাবিত বাজেট কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর জন্য নয়; বরং দেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে। তার মতে, একটি কার্যকর বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা অপরিহার্য। এসব উপাদান অনুপস্থিত থাকলে সরকার ঘোষিত বাজেটও বাস্তবায়নযোগ্য হয় না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ছায়া বাজেট প্রস্তাবনায় দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন ব্যয় এবং বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থবছর জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত হওয়ায় বছরের শেষ দিকে বর্ষা, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি দাবি করেন, এই সময়সীমার কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের বড় অংশ শেষ দুই মাসে তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়, যা কার্যত সঠিক বাস্তবায়ন নয় বরং অর্থের অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি করে।

তার মতে, বছরের শেষ সময়ে দ্রুত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা কমে যায় এবং এর সুফল জনগণের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের সময়সীমা ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর, পরিকল্পিত এবং স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না থাকলে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার হয় না। ফলে জনগণের করের টাকা কাঙ্ক্ষিত সেবায় রূপান্তরিত না হয়ে অপচয়ের শিকার হয়। এই বাস্তবতায় বিকল্প নীতিগত কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

জামায়াতের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত এই ছায়া বাজেটকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিকল্প মূল্যায়ন হিসেবে দেখছেন। অনেকেই মনে করেন, বিরোধী দলের এমন প্রস্তাবনা দেশের বাজেট প্রক্রিয়ায় নীতি বিতর্ক ও আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন মতও রয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছায়া বাজেট মূলত একটি রাজনৈতিক দল বা চিন্তাধারার অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে, যা সরাসরি সরকারি বাজেটের বিকল্প না হলেও নীতিনির্ধারণে পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ, উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বিষয়ে ভিন্ন মতামত নীতিনির্ধারকদের জন্য আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশে নির্বাচনী রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক দিন দিন জটিল হচ্ছে। এ ধরনের ছায়া বাজেট উপস্থাপন রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি ভোটারদের সামনে বিকল্প চিন্তাধারাও তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত দলীয় নেতারা আশা প্রকাশ করেন, তাদের এই প্রস্তাবনা ভবিষ্যতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক এবং টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেন, দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও স্থিতিশীল হবে।

দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাজেট ঘাটতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চ্যালেঞ্জের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর এই ছায়া বাজেট নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন নজর থাকবে, এই প্রস্তাবনা নীতিনির্ধারণী মহলে কতটা প্রতিফলন ঘটায় এবং দেশের বাজেট বিতর্ককে কতটা প্রভাবিত করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com