প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির নাজুক পরিবেশ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত সোমবার ইসরাইলি হামলায় দেশটির বিমান বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত এই দুই সেনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সংঘাত থামানোর যে প্রচেষ্টা চলছিল, এই ঘটনা সেই উদ্যোগকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (৮ জুন) সকালে ইসরাইলি বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক স্থানে হামলা চালায়। রাজধানী তেহরান, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবরিজ এবং মধ্যাঞ্চলের ইসপাহানে তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হামলার পরপরই দেশটির বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা ঘটনাস্থলে অভিযান শুরু করে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু হয়।
এই হামলায় ইরানের বিমান বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হওয়ার বিষয়টি সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের দাফনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা দেশটির দৃষ্টিতে ঘটনাটির গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন।
ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছিল। লেবাননে অব্যাহত সামরিক অভিযান বন্ধ না হওয়ায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনাও স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অন্যতম শর্ত হলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। কারণ হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে ইসরাইল গত ২ মার্চ থেকে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা। মানবিক সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
সংঘাতের এই আবহে গত রোববার (৬ জুন) ইসরাইল লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে বিমান হামলা চালায়। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ওই রাতেই উত্তর ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি করে।
এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার ইরানের অভ্যন্তরে ইসরাইলি হামলার ঘটনা ঘটে এবং ইরানও দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটিই দুই দেশের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরান ও ইসরাইল—উভয় পক্ষকে দ্রুত সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব পুরো অঞ্চল ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দুই দিনের তীব্র সংঘাতের পর ইরান ও ইসরাইল হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। তবে পরিস্থিতি যে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার কথোপকথনের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের পর।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছেন, তিনি যদি আবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে চান, তবে সেটি তাকে একাই করতে হবে। এর আগে ট্রাম্প স্বীকার করেছিলেন যে, পূর্ববর্তী এক কথোপকথনে তিনি নেতানিয়াহুকে “বদ্ধ পাগল” বলেছিলেন। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দুই মিত্র দেশের মধ্যে কৌশলগত মতপার্থক্যের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
অন্যদিকে বিবিসি নর্থ আমেরিকার সম্পাদক সারাহ স্মিথ জানিয়েছেন, ট্রাম্প তাকে ফোনে বলেছেন যে তিনি নেতানিয়াহুকে “কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করার” পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি “অত্যন্ত শক্তিশালী চুক্তি” স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও সেই সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সামান্য উত্তেজনাও বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন পক্ষের সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সফলতা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরাইলি হামলায় দুই ইরানি সেনার নিহত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি সামরিক সংবাদ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতির নতুন বাস্তবতার প্রতীক। যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি, শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে অঞ্চলটি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে। এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি থাকবে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় এবং এই উত্তেজনা আরেকটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নেয় কি না, সেদিকে।