প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ক্রিকেটের ১২তম আসর ঘিরে ইতোমধ্যেই উত্তেজনা শুরু হয়েছে ক্রিকেট অঙ্গনে। প্রতি আসরের মতো এবারও ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো নিজেদের দল সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে এবারের বিপিএলকে আগের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে একটি বিষয়—প্রথমবারের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর অনুরোধে ড্রাফট পদ্ধতি বাদ দিয়ে আয়োজন করা হচ্ছে খেলোয়াড় নিলাম। এই নিলামের মাধ্যমে দল গঠনের নিয়মনীতি ও আর্থিক কাঠামো প্রকাশ করেছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল, যা নিয়ে এখন ক্রিকেট মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা ও বিশ্লেষণ।
আগে ধারণা করা হয়েছিল, বিপিএলের এই নিলাম অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৭ নভেম্বর। তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা পিছিয়ে যাচ্ছে কয়েকদিনের জন্য। সম্ভাব্য নতুন তারিখ ধরা হয়েছে ২১ নভেম্বর। বিসিবি সূত্র জানিয়েছে, কিছু কারিগরি প্রস্তুতি ও সম্প্রচার সংক্রান্ত কারণে নিলামের তারিখ সামান্য পেছানো হয়েছে। কিন্তু এই বিলম্বেই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আগ্রহ বা উদ্দীপনা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং অনেকেই বলছেন, এবার নিলামেই নির্ধারিত হবে কোন দল কতটা শক্তিশালী স্কোয়াড গড়তে পারবে।
বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল ইতোমধ্যে স্থানীয় ও বিদেশি ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি ও ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করেছে। স্থানীয় খেলোয়াড়দের ছয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভিত্তিমূল্য নির্ধারিত হয়েছে ৫০ লাখ টাকা, যা প্রতি ডাকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা করে বাড়ানো যাবে। অর্থাৎ, এই ক্যাটাগরির খেলোয়াড়দের জন্য হতে পারে তুমুল বিড প্রতিযোগিতা। অন্যদিকে বিদেশি ক্রিকেটারদের জন্য থাকছে পাঁচটি ক্যাটাগরি, যেখানে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভিত্তিমূল্য ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার। এখানেও প্রতি ডাকে মূল্য বৃদ্ধি করা যাবে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত।
নিলাম থেকে প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে কমপক্ষে ১৩ জন স্থানীয় ক্রিকেটার কিনতে হবে। তাদের জন্য ব্যয় সীমা ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ কোটি টাকা। বিদেশি খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি দলকে অন্তত ২ জন নিতে হবে। সরাসরি চুক্তি বা প্রি-সাইনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি দল সর্বোচ্চ ২ জন স্থানীয় ও ২ জন বিদেশি ক্রিকেটার আগে থেকেই দলে ভেড়াতে পারবে। নিলাম ও সরাসরি চুক্তি মিলিয়ে বিদেশি খেলোয়াড়দের জন্য খরচ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এছাড়া বিসিবি প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজির কাছ থেকে নিচ্ছে ১০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি। ফলে বলা যায়, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে তাদের সম্পূর্ণ স্কোয়াড গঠনের খরচ ও খেলোয়াড় পারিশ্রমিক সেই টাকার মধ্যেই সামাল দিতে হবে। এ নিয়মের ফলে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তারা।
বিপিএলের এবারের নীতিমালায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিটি দল সর্বোচ্চ ১৬ জন স্থানীয় ক্রিকেটার রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে। রিজার্ভসহ মোট ২২ সদস্যের স্কোয়াড রাখার সুযোগ থাকবে। একাদশে বিদেশি ক্রিকেটারের সংখ্যা হবে সর্বনিম্ন ২ জন ও সর্বোচ্চ ৪ জন। অর্থাৎ, স্থানীয় খেলোয়াড়দের গুরুত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে এবারও ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে দেশি ক্রিকেটারদের দলে রাখার জন্য।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে এবারের আসরে নজর দেওয়া হয়েছে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক পরিশোধের নিয়মে। অতীতে বেশ কয়েকটি ফ্র্যাঞ্চাইজির বিরুদ্ধে সময়মতো খেলোয়াড়দের অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার গভর্নিং কাউন্সিল পারিশ্রমিক প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় খেলোয়াড়দের ২৫ শতাংশ পারিশ্রমিক সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে। এরপর লিগ পর্ব শেষ হওয়ার আগে দিতে হবে আরও ৫৫ শতাংশ, এবং টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে বাকি ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ সম্পন্ন করতে হবে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায় বিপিএল কর্তৃপক্ষ। বিসিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চাই না কোনো খেলোয়াড় তাদের পারিশ্রমিক নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগুক। বিপিএল এখন একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। তাই পেশাদারিত্ব বজায় রাখা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।”
অন্যদিকে, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে পরিকল্পনা ও হিসাব-নিকাশ। কে কোন খেলোয়াড়কে দলে নেবে, কত অর্থ ব্যয় করবে—সব কিছু নিয়েই চলছে পর্যালোচনা। অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজি ইতোমধ্যে তাদের কোচিং স্টাফ এবং বিশ্লেষক টিম গঠন করেছে, যারা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ডেটা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বিড কৌশল তৈরি করছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিলাম পদ্ধতি বিপিএলে নতুন এক মাত্রা যোগ করবে। ড্রাফটের তুলনায় নিলাম বেশি প্রতিযোগিতামূলক এবং নাটকীয়, যেখানে জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে বিড যুদ্ধ দেখা যায়। এই পদ্ধতি দর্শকদেরও বাড়তি আগ্রহ এনে দেবে, কারণ কে কত দামে কোন তারকাকে দলে ভেড়ায়—তা নিয়ে সবসময়ই থাকে তুমুল আলোচনার ঝড়।
অন্যদিকে, বিদেশি খেলোয়াড়দের উপস্থিতি নিয়েও চলছে জল্পনা। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল জানিয়েছে, ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের শতাধিক ক্রিকেটার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণের জন্য। আফগানিস্তান, ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়রা বিপিএল খেলতে নিবন্ধন করেছেন। ফলে এবারের নিলাম শুধু দেশি নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তারকাদেরও এক অনন্য সমাবেশে পরিণত হতে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের জন্যও এটি হতে যাচ্ছে নিজেদের প্রতিভা প্রমাণের বিশাল সুযোগ। স্থানীয় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স এখন শুধু জাতীয় দলের জন্যই নয়, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক তরুণ খেলোয়াড়ের জন্য এই নিলাম হতে পারে ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মঞ্চ।
সব মিলিয়ে, ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিপিএল নিলাম এবার ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এক রোমাঞ্চকর আয়োজন হয়ে উঠতে যাচ্ছে। যেখানে শুধু দল গঠনের প্রতিযোগিতা নয়, বরং দেখা যাবে পরিকল্পনা, আর্থিক কৌশল, পেশাদারিত্ব ও ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য সমন্বয়। বিসিবির কঠোর নিয়ম এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এবারের বিপিএল হবে আরও পরিপাটি, স্বচ্ছ এবং বিশ্বমানের আয়োজন—এমনটাই আশা করছে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।