প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রাক্কালে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) এক জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। রায়টি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের ভেতরে শুরু হয়েছে তৎপরতা, কারণ এই রায়ের প্রভাব পড়তে পারে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি ও সামগ্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর। ইসির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা এখন আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ইসির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের রায়কে তারা গুরুত্ব সহকারে দেখছে, কারণ এই রায় কার্যকর হলে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগ মুহূর্তে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই রায় শুধু ইসির জন্য নয়, ভবিষ্যতের যেকোনো কমিশনের জন্যও একটি নজির হয়ে থাকবে। যদি ইসি এই রায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে সংসদীয় আসনের বিন্যাসে আদালতের হস্তক্ষেপ নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করবে, যা নির্বাচন পরিচালনার স্বাধীনতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
গত সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের দ্বৈত বেঞ্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়, বাগেরহাট জেলায় পূর্বের চারটি সংসদীয় আসন বহাল থাকবে, আর গাজীপুরে একটি আসন কমানো হবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের করা আসন পুনর্বিন্যাস আংশিকভাবে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর আগে সংসদীয় আসনের সীমানা নিয়ে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আদালত ইসির সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। এমনকি অতীতের বিতর্কিত সময়গুলোতেও ইসির সিদ্ধান্তের ওপর আদালতের হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে বর্তমান রায়টি শুধু নির্বাচনী প্রস্তুতির সময়েই নয়, আইনগত দিক থেকেও এক ব্যতিক্রমধর্মী উদাহরণ তৈরি করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ৩০ জুলাই নির্বাচন কমিশন বাগেরহাটের চারটি আসনের মধ্যে একটি কমিয়ে তিনটি করার প্রস্তাব দেয়। পরবর্তীতে গত ৪ সেপ্টেম্বর ৩০০টি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে ইসি। এতে গাজীপুরে একটি আসন বাড়িয়ে মোট ছয়টি করা হয় এবং বাগেরহাটে একটি আসন কমিয়ে তিনটি করা হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও ভোটাররা আদালতে রিট দায়ের করেন।
রিট আবেদনের শুনানি শেষে গত ১৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চায় কেন বাগেরহাটের চারটি আসন বহাল রাখা হবে না এবং কেন ইসির সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। শেষ পর্যন্ত সোমবার আদালতের রায়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং আগের আসন কাঠামো বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
নির্বাচন বিষয়ক সিনিয়র আইনজীবী হাবিবুর রহমান বলেছেন, ইসির সীমানা পুনঃনির্ধারণ প্রক্রিয়া সংবিধানের পরিপন্থী নয় এবং তা সম্পূর্ণভাবে আইনসম্মত। তাঁর মতে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, এবং তাদের সিদ্ধান্তের ওপর বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ সংবিধানসম্মত নয়। তিনি বলেন, “সীমানা বিন্যাসের ক্ষেত্রে ইসি জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেনি। আইন অনুযায়ী তারা দায়িত্ব পালন করেছে। যদি ইসি এই রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত আপিল না করে, তাহলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।”
অন্যদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম মনে করেন, রায়টি এমন এক সময়ে এসেছে যখন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। তাঁর মতে, “এই রায়ের ফলে নির্বাচন কমিশন একটি নাজুক অবস্থায় পড়েছে। এখনই তাদের দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে, নয়তো নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।” তিনি আরও বলেন, “তফসিল ঘোষণার আগে যদি সীমানা নিয়ে মামলা নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে অনেক প্রার্থী ও ভোটার বিভ্রান্ত হবেন, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, “সীমানা নির্ধারণ নিয়ে প্রায় ৩০টি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে। এই রায়সহ অন্যান্য মামলার প্রভাব পড়তে পারে তফসিল ঘোষণায়। বাগেরহাটের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পেলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।” তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ইসি এখন অত্যন্ত সতর্কভাবে বিষয়টি সামলাতে চায়, যাতে কোনো সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি না হয়।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এই রায়কে “নির্বাচনী স্বাধীনতার জন্য হুমকি” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, সংবিধান ও সীমানা নির্ধারণ আইনে স্পষ্ট বলা আছে—নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “এই আইন অনুযায়ী ইসি একচেটিয়া ক্ষমতা রাখে। তাদের সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আদালতের পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে না। যদি এখন এ রায় বহাল থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের কমিশনগুলো এমনকি যৌক্তিক পরিবর্তন আনতেও ভয় পাবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি, বর্তমান সিইসি-র এখনই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা উচিত এবং আদালতের নজরে আনা উচিত যে, এর ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। যদি কমিশন এখন শক্ত অবস্থান না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রতিটি নির্বাচনকে ঘিরে আদালতে শত শত মামলা হবে, যা নির্বাচনের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করবে।”
ইসির ভেতরে এখন স্পষ্ট দুটি দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে। একপক্ষ মনে করছে, আদালতের রায় মানা উচিত এবং নতুন সীমানা পুনঃনির্ধারণে যাওয়া যেতে পারে; অন্যপক্ষের মতে, এই মুহূর্তে তা করলে নির্বাচনের সময়সূচি পেছাতে হতে পারে, যা রাজনৈতিকভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। তাছাড়া, যেহেতু নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা, তাই আদালতের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না গিয়ে আপিল বিভাগে যাওয়াই হবে সবচেয়ে বিচক্ষণ পদক্ষেপ।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসি কীভাবে এই সংকটের সমাধান করবে? আইনজীবী মহল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত আপিল করা ছাড়া আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। কারণ, সময় অল্প—তফসিল ঘোষণার আগে এই জটিলতা না মেটাতে পারলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে আশার কথা, নির্বাচন কমিশন বিষয়টি নিয়ে দোদুল্যমান নয়। তারা ইতোমধ্যে আইনি পরামর্শ নেওয়া শুরু করেছে এবং আপিলের খসড়া প্রস্তুত করছে বলে জানা গেছে। এখন দেখা বাকি—ইসি কত দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে পদক্ষেপ নেয়।
দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের ওপর এখন বড় দায়িত্ব। একদিকে তাদের সামনে আছে আদালতের রায়, অন্যদিকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এই পরিস্থিতিতে ইসির প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের নির্বাচনব্যবস্থার জন্য এক একটি নজির হয়ে থাকবে। ফলে এখন যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা শুধু ত্রয়োদশ নয়—বাংলাদেশের আগামীর গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করবে।