ঢাকা লকডাউন ঘিরে উত্তেজনা: নিরাপত্তার চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে পুলিশ, অচলাবস্থার হুমকিতে আওয়ামী লীগ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৯ বার
ঢাকা লকডাউন ঘিরে উত্তেজনা: নিরাপত্তার চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে পুলিশ, অচলাবস্থার হুমকিতে আওয়ামী লীগ

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠেছে। আগামী ১৩ নভেম্বরের এই কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সরকার বলছে, কোনোভাবেই অরাজকতা বা নাশকতা হতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, এই কর্মসূচি ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার একটি ‘জনঅভ্যুত্থানের প্রতীকী প্রতিরোধ’।

ঢাকা মহানগর পুলিশ ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, বৃহস্পতিবারের কর্মসূচিকে ঘিরে তারা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, র‍্যাব, ও সেনাবাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, “ঢাকার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। ১৩ নভেম্বরের আগে ও পরে কেউই আইন নিজের হাতে নিতে পারবে না। কোনো ধরনের সহিংসতা কঠোরভাবে দমন করা হবে।”

তবে, আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ভয় সৃষ্টি করছে এবং ‘জনগণের গণআন্দোলন’ ঠেকাতে দমননীতির আশ্রয় নিচ্ছে। দলটির মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, “এটি কোনো নাশকতার কর্মসূচি নয়। এটি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার রায়ের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ।”

এই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যেখানে বৃহস্পতিবার ঘোষণা হতে পারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দলের আরও দুই নেতার বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলার রায়। দলটি একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম বলেছেন, “শেখ হাসিনাকে সাজা দেয়ার পরিকল্পনা জনগণ মেনে নেবে না। আমরা লকডাউনের মাধ্যমে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলব।”

তবে সরকারের দাবি, এই ‘লকডাউন’ আসলে একটি পরিকল্পিত অরাজকতা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “১৩ নভেম্বরের আগে ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে কঠোর নজরদারি থাকবে। কোনো দল বা ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

গত কয়েকদিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোর জন্য সরকার সরাসরি আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেছে। পুলিশের তথ্যমতে, গত ১১ দিনে ১৭টি বিস্ফোরণ এবং ৯টি বাসে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ের সামনেও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনা জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করার উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “সরকারের প্রশ্রয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোই এসব ঘটাচ্ছে, যাতে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে দোষ চাপানো যায়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে প্রবেশ করেছে। বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, “আওয়ামী লীগ এই রায়কে তাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তবে সহিংস পথ বেছে নিলে দলটির ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই উত্তেজনা থামবে না, কারণ প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে কেবল সাময়িক শান্তি আনা যায়, স্থায়ী সমাধান নয়।”

সরকারের পক্ষ থেকে সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কোর কমিটির বৈঠকে স্পষ্ট জানানো হয়, ঢাকায় ১৩ নভেম্বর কোনোভাবেই ‘লকডাউন’ কার্যকর হতে দেওয়া হবে না। বৈঠকে উপস্থিত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতিমধ্যে কয়েকটি জেলা থেকে ঢাকায় প্রবেশ করা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নজরদারিতে রেখেছে।”

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ‘জনগণই হবে ঢাকাকে বন্ধ রাখার শক্তি’। দলটির মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত জানান, শেখ হাসিনা নিজেই ভার্চুয়ালি তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং দেশবাসীকে ‘অন্যায়ের বিচার রুখে দাঁড়ানোর’ আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ এই কর্মসূচি সফল করবে। ঢাকা হবে প্রতিরোধের প্রতীক।”

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি আদৌ আগের মতো আছে কি না। দলটির অনেক সিনিয়র নেতা বিদেশে, অনেকে আত্মগোপনে। দেশে থাকা অংশটুকুও সরকারের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। তাই এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, “ঢাকা শহরে এখন একটি ছোট ঘটনারও বড় প্রভাব পড়তে পারে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে যদি সহিংসতা হয়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।”

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন কয়েকটি বিরোধী দলও ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির প্রতিবাদে মিছিল ও সভা করেছে। ‘জুলাই ঐক্য’ নামের একটি রাজনৈতিক জোট ঘোষণা দিয়েছে, তারা আওয়ামী লীগের লকডাউন প্রতিরোধ করবে। তাদের মতে, “একটি নিষিদ্ধ দল কোনোভাবেই রাষ্ট্রবিরোধী কর্মসূচি চালাতে পারে না।”

এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত। ঢাকার অনেক এলাকাতেই দোকানপাটে ক্রেতা কমে গেছে, গণপরিবহনও চলছে সতর্কভাবে। ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু ভয় পাই। বাসে আগুন, ককটেল—এসব দেখলে মনে হয় আবার হয়তো পুরোনো সময় ফিরে আসছে।”

ঢাকার রাজপথে এখন টহল দিচ্ছে পুলিশ ও বিজিবি। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে ট্রাইব্যুনাল, বিমানবন্দর, সচিবালয়, গণভবন এবং বিদেশি দূতাবাস এলাকায়।

সবমিলিয়ে, শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘিরে বাংলাদেশ যেন আরেক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আওয়ামী লীগের ‘লকডাউন’ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার অপেক্ষায় সবাই। কিন্তু তার আগেই, রাজধানী ঢাকায় এক অজানা অচলাবস্থার ছায়া ঘনিয়ে আসছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত