কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল রাত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৮৫ বার
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল রাত

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) বুধবার রাতের বিক্ষোভে যেন পরিণত হয় প্রতিবাদের এক উত্তপ্ত মঞ্চে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা শত শত কণ্ঠে ফেটে পড়ে স্লোগানে, প্রতিধ্বনিত হয় “বিচার চাই”, “আওয়ামী মুক্ত বাংলাদেশ চাই” দাবির শ্লোগান। তাদের কণ্ঠে, হাতে, চোখে ছিল স্পষ্ট এক প্রতিজ্ঞা—বাংলাদেশে আর কখনো যেন দমন-পীড়নের রাজনীতি ফিরে না আসে।

বুধবার (১২ নভেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে থেকে শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল। প্রতিবাদী তরুণদের ঢল নামতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও আবাসিক এলাকা থেকে। মুহূর্তেই ‘ছাত্র আন্দোলন চত্বর’ হয়ে ওঠে স্লোগানে মুখরিত। “একটা একটা লীগ ধর, জেলে ভর”, “বিচার বিচার চাই, পিলখানার বিচার চাই”, “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা”—এমন সব শ্লোগানে কেঁপে ওঠে ক্যাম্পাস। বিক্ষোভ মিছিলটি ছাত্র আন্দোলন চত্বর প্রদক্ষিণ করে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে এসে শেষ হয়।

এ বিক্ষোভ শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল না—এটি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভের এক বিস্ফোরণ। শিক্ষার্থীদের ভাষায়, তারা সেই শক্তির বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ জানাচ্ছে, যারা দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতায় থেকে দমননীতি, নিপীড়ন ও গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছে।

লোক প্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, “কয়েকদিন যাবৎ নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ফের নাশকতা শুরু করেছে। তারা আবারও আগুন-সন্ত্রাসের রাজনীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা সেই অপচেষ্টা নস্যাৎ করব। বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদ আমরা বিদায় করেছি, তাকে আর ফিরতে দেব না। ১৩ নভেম্বর যদি কোনো আওয়ামী লীগার রাস্তায় নামে, আমরা আবারও এই এলাকাকে আওয়ামীবিহীন করবো।”

গণিত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী গোলাম মুস্তফা বলেন, “আওয়ামী লীগ ১৭ বছর ধরে দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল। তারা গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন—কোন অপরাধ করেনি? তারা আইসিটি আইনের মাধ্যমে মানুষের মুখ বন্ধ করে রেখেছিল। এখন তারা বিদেশে বসে তাদের সহযোগীদের দিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমরা তাদের হুঁশিয়ার করছি, যদি বাড়াবাড়ি করে, তাহলে কঠিন জবাব পাবে।”

শিক্ষার্থীদের এই অবস্থান শুধু ক্ষোভের প্রকাশ নয়, বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলনও বটে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের গোপন কর্মকাণ্ডের খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিদিনই। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে ছোট ছোট অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, এই ধরনের তৎপরতা আবারও দেশকে অস্থিতিশীল করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।

ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী রাহিম বলেন, “বিদেশে বসে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টির নির্দেশ দিচ্ছে। তারা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, দেশের অর্জিত স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায়। কিন্তু আমরা, দেশের তরুণ প্রজন্ম, তা হতে দেব না। বাংলাদেশে শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য আমরা মাঠে থাকব।”

প্রতিবাদে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জানান, তারা এই বিক্ষোভ আয়োজন করেছেন সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে নয়। তাঁদের মতে, ‘দেশের স্বার্থে’ তরুণ সমাজকে এখন ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে আর কোনো দমননীতি বা দলীয় সন্ত্রাসের রাজনীতি বাংলাদেশে স্থান না পায়।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সোয়াইব হোসেন আমিন বলেন, “আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে দেশের হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে। তারা ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। আজ তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েও আবার মাথা তুলতে চাইছে। আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশে আর আওয়ামী লীগের জায়গা নেই। তারা অরাজকতা করতে চাইলে মাঠেই জবাব দেওয়া হবে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। এই বিক্ষোভ তাদের রাজনৈতিক চেতনার জাগরণ। তারা বুঝে গেছে—গণতন্ত্র মানে দল নয়, জনগণের ক্ষমতা।”

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি, তবে সূত্র বলছে, প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। রাতভর ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

এদিকে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও কুবির শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। টুইটার, ফেসবুক ও এক্স প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, হাজারো শিক্ষার্থী হাতে মশাল, ব্যানার ও পতাকা নিয়ে আওয়াজ তুলছেন “বাংলাদেশ হবে অন্যায়মুক্ত”, “স্বাধীনতার নামে দমন নয়”, “আওয়ামী লীগ আর নয়”।

দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় কুবির এই প্রতিবাদ যেন নতুন এক তরঙ্গ তৈরি করেছে। শুধু কুমিল্লা নয়, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অনুরূপ বিক্ষোভের প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এই ক্ষোভ দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁরা মনে করছেন, কুবির বিক্ষোভ কেবল একটি ঘটনার প্রতিবাদ নয়, বরং একটি প্রজন্মের ক্ষোভের বিস্ফোরণ, যারা অতীতের অন্যায় ও স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তি চায় না।

রাতভর ক্যাম্পাসে ধ্বনিত স্লোগানগুলো যেন এক নতুন প্রতিজ্ঞার প্রতিচ্ছবি—বাংলাদেশের রাজনীতি আর আগের জায়গায় ফিরবে না। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস, এই প্রতিবাদের আগুনই হবে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সূচনা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিক্ষোভ তাই শুধু একটি রাতের ঘটনা নয়—এটি এক যুগান্তকারী বার্তা, যে তরুণ প্রজন্ম এখন অন্যায়, দমন ও ভয়কে জয় করে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুনভাবে লিখতে প্রস্তুত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com