প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে দীর্ঘ চার বছর ধরে চলমান রক্তপাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র নতুনভাবে একটি গোপন শান্তি প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে। তবে এই প্রস্তাবটি কেবল শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে ইউক্রেনকে তাদের কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে এবং সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করতে হবে। বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এই প্রস্তাবের বাস্তবায়নে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বাধ্য করার ইঙ্গিতও রয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এক সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, খসড়া প্রস্তাবটি মূলত রাশিয়ার পক্ষকে সুবিধাজনক করে গঠিত হয়েছে। কিয়েভের জন্য এই প্রস্তাবের শর্তগুলো সহজ নয় এবং প্রস্তাবের বড় অংশই রাশিয়ার দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি আলোচনা পর্যায়ে বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়া কিয়েভের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগের পেছনে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শের বিষয়টি উঠে এসেছে। যদিও রাশিয়া এখনও নতুন কোনো শান্তি প্রস্তাবের বিষয়টি অস্বীকার করেছে, তবু যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এটি কৌশলগতভাবে প্রণীত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবের মূল খসড়ায় বলা হয়েছে, ইউক্রেনকে দনবাসের পূর্বাঞ্চলের বাকি অংশ ছাড়তে হবে। এর মধ্যে রয়েছে কিছু অঞ্চল, যা বর্তমানে কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে আছে। এছাড়া ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী অর্ধেকের বেশি হ্রাস করতে হবে এবং নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রও ত্যাগ করতে হবে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, এই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ইউক্রেনের জন্য পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তবে তা নির্দিষ্ট শর্তের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এছাড়া খসড়া প্রস্তাবে রুশ ভাষাকে ইউক্রেনের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চের ইউক্রেনীয় শাখাকেও সরকারি মর্যাদা প্রদানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই শর্তগুলো রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে মান্যতা দেওয়ার দিক নির্দেশ করে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এ সপ্তাহে ফ্লোরিডার মিয়ামিতে ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব রুস্তেম উমেরভের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে প্রস্তাবিত ২৮ দফার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়, যা ইউক্রেনের ভূখণ্ড ও সামরিক শক্তি হ্রাসের শর্ত ছাড়াও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক শর্ত রাখে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, রক্তপাত বন্ধ এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব কার্যকর ও শক্তিশালী হতে হবে। তিনি আরও বলেন, সব অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে শান্তি প্রক্রিয়া সফল হয় এবং দেশের নিরাপত্তা বজায় থাকে।
খবরে বলা হয়েছে, ফ্লোরিডার বৈঠকের পরেও প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে এটি রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক এবং কিয়েভের জন্য কঠিন, এমনটাই জানা গেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে দেশের স্বাধীনতা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রয়টার্সের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন খসড়া প্রস্তাবে কেবল ভূখণ্ড ছাড়ার বিষয়ই নয়, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর আকার কমানোও অন্তর্ভুক্ত। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা নীতি ও সামরিক প্রস্তুতি ব্যাপকভাবে সীমিত হবে। এর ফলে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূখণ্ড সংরক্ষণের সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন শান্তি প্রস্তাব যুদ্ধের দীর্ঘদিনের চাপে থাকা ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে যে প্রস্তাবিত সমঝোতা করা হচ্ছে, তা কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নয়, বরং সামরিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধ স্থাপন ও শান্তি প্রক্রিয়ার প্রভাব বিশ্লেষণকারী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, এটি ইউক্রেনের জন্য কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে দীর্ঘদিনের রক্তপাত বন্ধ এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।