প্রকাশ: ৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও এক ভয়াবহ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা ছাপিয়ে ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলা পুরো অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই সংকটময় মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কঠোর বার্তা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান ইস্যুতে ইসরায়েল যদি নতুন করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে সেই দায়ভার ইসরায়েলকে একাই বহন করতে হবে। ট্রাম্পের এই সতর্কবার্তা শুধু মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিকেই স্পষ্ট করেনি, বরং ইসরায়েলের যুদ্ধ কৌশলের ওপর ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান বিরক্তকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের এক ভয়াবহ প্রাণঘাতী বোমাবর্ষণের মধ্য দিয়ে। এই হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে মোড় নেয়। ইরান, যারা দীর্ঘ সময় ধরে লেবাননের যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখে আসছে, তারা ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের জবাবে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, তাদের এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের আগ্রাসনের একটি সরাসরি জবাব। এই আকস্মিক সংঘাতের পর ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে পাল্টা হামলা চালায়। জবাবে ইরানও হাইফাতে ইসরায়েলি সামরিক স্থাপনা ও বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা পরিচালনা করে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি উভয় পক্ষকেই দ্রুত সামরিক তৎপরতা বন্ধ করার আহ্বান জানান। ট্রাম্পের মতে, শান্তির জন্য চূড়ান্ত আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, কোনো ধরনের মূর্খতা বা অহেতুক উসকানিমূলক কাজ এই শান্তির পথকে রুদ্ধ করতে পারে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ফোন করেও সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন। বিশেষ করে ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কণ্ঠস্বরে নেতানিয়াহুর প্রতি স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ পাওয়া গেছে। তিনি সরাসরি তাকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘বিবি, আপনার সতর্ক থাকা উচিত, নইলে খুব শিগগিরই আপনাকে একাই লড়তে হবে।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের গভীর অর্থ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সুরক্ষায় সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর অন্ধভাবে যেকোনো যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই সরাসরি সংঘাত বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক ভূ-রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই সংঘাতের জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন নিজেই যেহেতু যুদ্ধবিরতি আলোচনার একটি অংশ, তাই ইসরায়েলের যেকোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের দায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিতে হবে। বাঘাইয়ের এই বক্তব্য বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এবং ইসরায়েলের এই পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা কাঠামোতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। একদিকে যেমন ইসরায়েল তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে মরিয়া, অন্যদিকে ইরানও তাদের আঞ্চলিক প্রভাব ও প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রদর্শনে কোনো ছাড় দিতে নারাজ। এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে। তিনি চাইছেন যুদ্ধ থামিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছাতে। তবে যুদ্ধের ময়দানে থাকা পক্ষগুলো কতটা নমনীয় হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। কারণ, উভয় দেশই অভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ এবং জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে এই সামরিক অভিযানে লিপ্ত হয়েছে।
ইসরায়েল ও ইরানের এই সংঘাতের প্রভাব কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বিশাল হুমকি। যদি সত্যিই কোনো বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায়, যা হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বড় সংকট তৈরি করতে পারে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবারই এই দিকটি মনে করিয়ে দিচ্ছে। তারা বলছে, মার্কিন মদত ছাড়া ইসরায়েলের এই আগ্রাসন চালানো সম্ভব হতো না। তাই পরিস্থিতির এই অবনতির দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ ওয়াশিংটনের নেই। ট্রাম্পের এই সতর্কতা কি আসলে ইসরায়েলকে নিবৃত করতে পারবে, নাকি নেতানিয়াহু তার নিজস্ব রণকৌশল বজায় রাখবেন—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা। ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান এবং নেতানিয়াহুর প্রতি তার সতর্কবার্তা পরিস্থিতির এক নতুন মোড়কে সামনে আনছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলি সামরিক সহায়তার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থানের ফলে পুরো অঞ্চলে যে মানবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ববাসীকে শঙ্কিত করে তুলছে। সাধারণ মানুষ এখন কেবলই যুদ্ধের সমাপ্তি এবং শান্তি আলোচনার প্রত্যাশায় দিন গুনছে। তবে কূটনীতি আর সামরিক শক্তির এই ভারসাম্যহীন লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত হুঁশিয়ারি কি শেষ পর্যন্ত একটি বড় যুদ্ধের সম্ভাবনাকে রুখে দিতে পারবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পথে হাঁটবে, তা এখন দেখার বিষয়।