প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চট্টগ্রাম নগরের কদমতলী এলাকায় একটি কম্বলের গোডাউনে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে, যা মুহূর্তেই চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। এলাকাজুড়ে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেলে স্থানীয়রা বিষয়টি দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে জানান। সোমবার দুপুর ২টার দিকে এই আগুনের সূত্রপাত হয় বলে নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে কম্বলের গোডাউনে থাকা দাহ্য সামগ্রী দ্রুত জ্বলে ওঠে এবং কিছু সময়ের মধ্যে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়।
ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে, কিন্তু শুরু থেকেই তাদের কাজ কঠিন হয়ে উঠে। দাহ্য কম্বল, প্যাকেজিং সামগ্রী এবং বিশাল স্টকভর্তি গোডাউনের ভেতরের উত্তপ্ত পরিবেশ আগুন নেভানোর কাজকে ধীর করে দেয়। ফায়ার সার্ভিস কন্ট্রোল রুমের একজন ডিউটি অফিসার জানান, তারা খবর পাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি বলেন, দুপুর ২টার দিকে খবর পাই এবং বুঝতে পারি এটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড হতে পারে। গোডাউনে প্রচুর দাহ্য মালামাল থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগছে।
গোডাউনের ভেতর তখন দুপুরের বিরতি চলছিল, তাই বেশিরভাগ শ্রমিক বাইরে ছিলেন। এ কারণে হতাহতের কোনো খবর এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, কারণ গোডাউনে তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং ব্যক্তিগত মালপত্রও ছিল। অনেকে ছুটে এসে গোডাউনের সামনে ভিড় করেন এবং ভেতরের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আগুন লাগার আগে তারা হঠাৎ করে ধোঁয়া বের হতে দেখেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধোঁয়া আগুনে রূপ নেয় এবং গোডাউন থেকে বড় শিখা বের হতে শুরু করে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, প্রথমে তারা পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তা কোনো কাজে আসেনি। গোডাউনের সংকীর্ণ গলি এবং এক পাশের দেয়ালে সাজানো মালামাল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে, কারণ আশপাশের দোকানগুলোতে ওয়ারহাউসের মতো দাহ্য বিভিন্ন পণ্য থাকে। আগুন আশপাশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও ছিল। স্থানীয়রা আশঙ্কা করেন, আগুন আরও কিছু সময় ধরে ধরে রাখতে পারলে পুরো এলাকার বেশ কিছু দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারত বলে জানান দোকানিরা।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর গোডাউনের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনে কয়েক কোটি টাকার কম্বল ও অন্যান্য সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গোডাউনের মালিক এখনো ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায় বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান, এখানে বিভিন্ন ধরনের কম্বল, শীতপোশাক এবং ডেলিভারির অপেক্ষায় থাকা পণ্য মজুত ছিল।
আগুন লাগার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। ফায়ার সার্ভিস বলছে, তারা আগুন নেভানোর পর তদন্ত করে কারণ নির্ণয় করবে। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিদ্যুতের শর্টসার্কিট, সিগারেটের আগুন, কিংবা কোনো দাহ্য রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তদন্ত কমিটি এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সঠিক কারণ বের করবে।
এলাকাবাসী মনে করছেন, গোডাউনের ভেতর আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। অনেকেই দাবি করেছেন যে, এখানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র থাকলেও সেগুলো কার্যকর ছিল না। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে যদি এগুলো ব্যবহার করা যেত, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি এতটা বড় হত না। ফলে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম নগর এলাকায় শিল্পকারখানা, গোডাউন এবং দোকানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডে মিল্কি স্টোরসহ অনেক গুদাম পুড়ে যায়। প্রতিটি ঘটনায় দাহ্য সামগ্রী এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাবকে বড় কারণ হিসেবে দেখা যায়। কদমতলীর এই ঘটনা আবারও সেই দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, তারা আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাবে। তারা আশা করছে, দ্রুত আগুন নেভাতে পারলে আশপাশের এলাকা রক্ষা পাবে। এলাকাজুড়ে এখনো পানি ঢালার শব্দ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মতৎপরতা এবং উদ্বিগ্ন দোকানিদের ভিড় থেকে উত্তেজনা টের পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আগুনের কারণে পুরো কদমতলী এলাকাজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকায় চলাচলে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে জনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তারা এলাকাবাসীদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার অনুরোধ করেছে।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তদন্ত দল সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। তারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবে এবং সম্ভাব্য আগুন লাগার উৎস নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করবে। চট্টগ্রামের এ ধরনের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন অগ্নিকাণ্ডে ভবিষ্যতে আরও সতর্কতা বাড়ানোর দাবি তুলছে স্থানীয়রা।
এই অগ্নিকাণ্ড স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। শীত মৌসুম সামনে হওয়ায় কম্বলের কেনাবেচা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে। কিন্তু এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে গোডাউন মালিকসহ ব্যবসায়ীরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। শ্রমিকরাও তাদের চাকরি এবং আয়ের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
দমকল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর তারা গোডাউনের চারপাশে আরও আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে কি না তা পরীক্ষা করবেন। বর্তমানে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিট সতর্ক অবস্থায় আছে।
কদমতলীতে কম্বল গোডাউনে আগুনের এই ঘটনা চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় বলে মনে করা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে বড় বিপর্যয় ঠেকানো গেছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।