জামায়াতের ‘জাতীয় সমাবেশ’: রাজপথে ফেরার কৌশল না নির্বাচনী শোডাউন?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৫ বার
জামায়াতের ‘জাতীয় সমাবেশ’: রাজপথে ফেরার কৌশল না নির্বাচনী শোডাউন?

প্রকাশ: ০৯ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজনীতির মূল স্রোত থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৯ জুলাই রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘জাতীয় সমাবেশ’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াতে যাচ্ছে। সাত দফা দাবিকে সামনে রেখে এই সমাবেশ ঘিরে দলটির ভেতরে যেমন প্রস্তুতির তৎপরতা তুঙ্গে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এই সমাবেশ কি কেবল দাবি উত্থাপন, না কি তা আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে শক্তি প্রদর্শনের একটি কৌশলগত ‘পাওয়ার পজিশনিং’?

জামায়াত নেতারা এই সমাবেশে কয়েক লাখ নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থক হাজির করার লক্ষ্য নিয়েছেন। এজন্য দেশব্যাপী চলছে গণসংযোগ, প্রচার ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকা বিএনপি ও বাম ঘরানার দলগুলোকেও সমাবেশে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে জানানো হয়েছে।

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানিয়েছেন, ৭ দফা দাবিকে সামনে রেখে এই সমাবেশ মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতিরই একটি প্রকাশ্য অংশ। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে গণহত্যার বিচার, পিআর (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতিতে নির্বাচন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন ইত্যাদি।

জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দলের সর্বোচ্চ স্তরের নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক শেষে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের ফসল হিসেবে তারা এই গণজাগরণকে নির্বাচনের প্ল্যাটফর্মে রূপ দিতে চান। এর মাধ্যমে জনগণের ‘আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্যতা’র প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন বলে দাবি তার।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সমাবেশ শুধু একটি জনসমাবেশ নয়—বরং তা ভবিষ্যতের নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণে একটি মাইলফলক। জামায়াত পুনরায় নির্বাচনের ময়দানে ফিরেছে। দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ফিরে পাওয়ার পরই বিভিন্ন আসনে প্রার্থী চূড়ান্তকরণসহ নির্বাচনি সংগঠন তৈরি করছে। প্রত্যেক এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্য দিয়ে চলছে সাংগঠনিক পুনর্গঠন।

দলের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সম্প্রতি জানান, নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হলেও তাদের আপত্তি নেই, তবে তা যেন একটি অর্থবহ নির্বাচন হয়। তারা প্রচলিত পদ্ধতির বদলে ‘পিআর পদ্ধতি’ বাস্তবায়নের কথা জোর দিয়ে বলছে, যেখানে প্রতিনিধিত্ব অধিকতর ন্যায্যভাবে প্রতিফলিত হয়।

১৯ জুলাইয়ের সমাবেশ উপলক্ষে ইতোমধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৩৬x৩১ ফুট মঞ্চ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এলইডি স্ক্রিন, পর্যাপ্ত সিসিটিভি এবং স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত করে আয়োজনকে সফল করার প্রয়াস চলছে। বিশেষ করে ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ব্যাপকভাবে মাঠে নেমেছে বলে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতের নির্বাচনি কৌশলের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গঠনের চেষ্টা। তবে সেখানে রয়েছে জটিলতা ও বিভক্তির বাস্তবতা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা থাকলেও দুই দলের মধ্যে ঐক্যের ইতিহাস নেই। ১৯৭৯ সালের পর থেকে জামায়াতের সঙ্গে অন্য কোনো ইসলামি দলের মঞ্চ ভাগাভাগির নজিরও নেই। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কিছু মৌলিক পার্থক্য এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে আস্থার অভাবই এই ঐক্যকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।

জামায়াত যে প্রায় সব আসনে একক প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে তা সামনে রেখে প্রশ্ন উঠছে—যদি জোট হয়ও, শরিকদের জন্য কতটা ছাড় দেবে দলটি? অপরদিকে, জামায়াতের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া বা তার অধীনে আসার বিষয়ে বাকি ইসলামি দলগুলোর কতটা আগ্রহ বা প্রস্তুতি রয়েছে, তাও স্পষ্ট নয়। এসব বাস্তবতা সামনে রেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসলামি ঐক্যের প্রয়াস যতই থাকুক, সেটি সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর গৃহীত বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।

সব মিলিয়ে, জামায়াতের এই সমাবেশ একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত তৈরি করতে পারে যদি তা বাস্তব জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। অন্যথায়, এটিও হতে পারে কেবলমাত্র একটি ‘পাওয়ার ডেমোনস্ট্রেশন’, যার পরিণতি নির্ভর করবে নির্বাচনি বাস্তবতা এবং রাজনীতির গতি প্রকৃতির ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত