বুয়েটে শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অ্যালামনাইদের ক্ষোভ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৫৫ বার
বুয়েটে শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অ্যালামনাইদের ক্ষোভ

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট দীর্ঘদিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ প্রযুক্তিগত শিক্ষা-গবেষণার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। মেধা, যোগ্যতা, পেশাদারিত্ব এবং কঠোর মানদণ্ড—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক নিয়োগও সবসময় উচ্চমানের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসছে বলে অ্যালামনাইদের বিশ্বাস। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগে প্রভাষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি তাদের দীর্ঘদিনের আস্থা ও গৌরবে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। নিয়োগ–বিতর্ক ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অ্যালামনাই গ্রুপ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী প্ল্যাটফর্মে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

২২ নভেম্বর প্রকাশিত বুয়েটের এক অফিস আদেশ থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত। সেখানে জানানো হয়, সিন্ডিকেটের অনুমোদনের ভিত্তিতে সিলেকশন বোর্ডের সুপারিশমাফিক বিভিন্ন বিভাগে নতুন প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা শারীরিক উপযুক্ততা এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অস্থায়ীভাবে চূড়ান্ত ধরা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মনে করে এটি নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কিছু বিভাগে দীর্ঘদিনের প্রচলিত মেধা-অগ্রাধিকার নীতি ভঙ্গ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিবারের সদস্যদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, বুয়েটে সাধারণত সর্বোচ্চ সিজিপিএধারী বা মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরাই শিক্ষক পদে প্রথম সুযোগ পান। এই নীতি শুধু নিয়ম নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠোর মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধরে রেখেছে। কিন্তু এবার সেই নীতি উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের মতে, কিছু বিভাগে মেধার ভিত্তিতে শীর্ষে থাকা প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম ফলাফলধারী প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। জানা যায়, এই বিভাগে ৩ দশমিক ৭৩ সিজিপিএ পাওয়া একজন প্রার্থীকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, তিনি একই বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপকের স্ত্রী। অথচ সেই একই পদে আবেদনকারী বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক ৯০ থেকে ৪ দশমিক শূন্য পর্যন্ত। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলছেন, এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে কম সিজিপিএধারী একজন প্রার্থী এগিয়ে গেলেন এবং কেন সেরা ফলাফলধারীদের উপেক্ষা করা হলো। এ নিয়ে অ্যালামনাই গ্রুপগুলোতে ব্যাপক আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে এটিকে বুয়েটের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেন।

আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে পানি সম্পদ কৌশল বিভাগ বা ডব্লিউআরই বিভাগে প্রভাষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে। এই বিভাগে দুটি শূন্যপদে আবেদনকারীদের মধ্যে ১৯তম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী প্রথম স্থান এবং একই ব্যাচের আরও একজন দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তাদের দুজনেরই সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক ৯৪—ফলের ব্যবধান খুবই সামান্য। এই দুই মেধাবী আবেদনকারীর মধ্যে প্রথম স্থানে থাকা শিক্ষার্থীকে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়। আরও বিস্ময়কর হলো, ১৮তম ব্যাচের দ্বিতীয় স্থানধারী প্রার্থীও নির্বাচিত হননি; বরং ১১তম ব্যাচের তৃতীয় স্থান পাওয়া একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বুয়েটের একজন অধ্যাপকের মেয়ে এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপকের স্ত্রী।

এমন তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই অ্যালামনাই মহলে তীব্র ক্ষোভ বাড়তে থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অ্যালামনাই জানান, বুয়েটের ইতিহাসে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ সবসময়ই স্বচ্ছ ছিল। অতীতে আত্মীয়-স্বজন নিয়োগ পেলেও তারা মেধা তালিকার শীর্ষস্থানেই ছিলেন। তাই তেমন অভিযোগ গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। মেধার শীর্ষে থাকা প্রার্থীদের বাদ দেওয়ায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের নৈতিক স্খলন এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর দাবি, এই ঘটনা বুয়েটের স্বাভাবিক ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে গেছে এবং প্রতিষ্ঠানের সম্মান হুমকির মুখে ফেলেছে।

বুয়েটের অ্যালামনাইদের অনেকেই মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটি শুধু উন্নত গবেষণা নয়, বরং ন্যায্যভাবে শিক্ষক ও গবেষক নিয়োগের সুনাম দিয়েই গড়ে উঠেছে। সেই ধারার ব্যত্যয় হলে ক্ষতি হবে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার গুণগত মানের। অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, যদি এমন উদাহরণ স্থায়ীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় জায়গা পায়, তবে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে দেশের প্রকৌশল শিক্ষা ও গবেষণা খাতে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু বোরহান মোহাম্মদ বদরুজ্জামান গণমাধ্যমকে দেওয়া মন্তব্যে বলেছেন, শিক্ষক নিয়োগে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থই আমাদের প্রথম বিবেচ্য। যে কেউ এটি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারেন, কিন্তু আমরা প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা মেনেই নিয়োগ দিয়েছি। এখানে স্বজনপ্রীতির কোনো প্রশ্নই আসে না।’’

উপাচার্যের বক্তব্য সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট অ্যালামনাইদের একটি বড় অংশ মনে করেন, যদিও নীতিমালা অনুযায়ী সবকিছু করা হয়ে থাকতে পারে, তবুও বুয়েটের দীর্ঘদিনের প্রচলিত মেধা-অগ্রাধিকার নীতি উপেক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, নীতিমালা শুধু একটি কাঠামো, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার অদৃশ্য নৈতিক মূল্যবোধে, যা তাকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করে। সেই মূল্যবোধেই এবার আঘাত লেগেছে।

বুয়েটে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়তো আইনি কাঠামো দিয়ে মাপা যাবে না; তবে এর সামাজিক ও নৈতিক গুরুত্ব অনেক গভীর। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধা-অগ্রাধিকার নিয়ে একটি বড় অংশের আস্থা নড়বড়ে হয়ে গেলে এর অভিঘাত বহুদিন পর্যন্ত বহন করতে হতে পারে। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও হতাশা দেখা যাচ্ছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, যোগ্যতা থাকলেও যদি আত্মীয়তার সম্পর্কই শেষ কথা হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা কোথায় দাঁড়াবে।

এই বিতর্ক কেবল একটি নিয়োগকে কেন্দ্র করে নয়, বরং একটি ঐতিহ্য, আস্থা এবং নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয় প্রশাসন কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষা এবং আস্থার পুনর্গঠন করে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠা মানেই দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হওয়া, কারণ এটি শুধু নিয়োগ–বিতর্ক নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত