কলম্বিয়ায় স্কুলবাস খাদে, শিক্ষার্থীসহ নিহত ১৭

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬২ বার
কলম্বিয়ায় স্কুলবাস খাদে, শিক্ষার্থীসহ নিহত ১৭

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তর কলম্বিয়ায় এক হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু-কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কসহ অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একটি স্কুলবাস পাহাড়ি সড়ক থেকে গভীর খাদে পড়ে গেলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ জন, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও হাসপাতাল সূত্র। নিহত ও আহতদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী, যারা গ্র্যাজুয়েশন উপলক্ষে সমুদ্রভ্রমণ শেষে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরছিলেন।

স্থানীয় সময় ভোর আনুমানিক ৫টা ৪০ মিনিটে অ্যান্টিওকুইয়া বিভাগের রেমেদিওস ও সারাগোসা সংযোগকারী সড়কের এল চিসপেরো এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রাথমিক তদন্ত সূত্রে জানা যায়, স্কুলবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় ৮০ মিটার গভীর খাদে গড়িয়ে পড়ে। বাসটিতে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মিলিয়ে মোট ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় ঘটনাস্থলেই অনেকের মৃত্যু হয়, বাকিদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কলম্বিয়ার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডেইলি মেইলের বরাতে জানা গেছে, বাসটি ক্যারিবিয়ান উপকূলীয় শহর টোলু থেকে দেশটির অন্যতম বড় শহর মেডেলিনের দিকে যাচ্ছিল। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অ্যান্টিওকুইয়ার গভর্নর আন্দ্রেস জুলিয়ান দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বাসটিতে লিসিও অ্যান্টিওকুয়েনো হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা ছিলেন, যারা সমুদ্রসৈকতে তাদের গ্র্যাজুয়েশন উদযাপন শেষে ফিরছিলেন।

গভর্নর আন্দ্রেস জুলিয়ান বলেন, ডিসেম্বরের এমন উৎসবমুখর সময়ে এই দুর্ঘটনা শুধু নিহতদের পরিবার নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এল কলোম্বিয়ানো জানায়, দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে অংশ নেন। পরে পুলিশ, দমকল বাহিনী ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করেন। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় উদ্ধারকাজে বেশ বেগ পেতে হয়। অনেক আহতকে স্ট্রেচার ও অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিতে হয়েছে।

সেগোভিয়ার মেয়র এডউইন কাস্তানেদা জানান, আহতদের বয়স ১৬ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। তাদের সেগোভিয়া ও রেমেদিওসের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রেমেদিওসের সান ভিসেন্তে দে পল হাসপাতালে অন্তত ১৬ জন আহতকে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১২ জন কিশোর। কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে বাসচালক জনাতান তাবোর্দা কোকাকোলোও রয়েছেন। তিনি পর্যটন পরিবহন সংস্থা প্রিকালচারের হয়ে কাজ করতেন। শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার সময় তিনি ক্যারিবীয় উপকূল থেকে মেডেলিনে যাত্রী নিয়ে ফিরছিলেন। আনতিওকিয়া পর্যটন নেটওয়ার্ক তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, এই ভ্রমণটি স্কুলের কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির অংশ ছিল না। শিক্ষার্থীরাই নিজেদের উদ্যোগে গ্র্যাজুয়েশন উদযাপনের জন্য এই সফরের আয়োজন করেছিলেন। তবে দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনায় তারা গভীরভাবে শোকাহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে।

লিসিও অ্যান্টিওকুয়েনো হাই স্কুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় জানায়, ‘আমাদের শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ২০২৫ সালের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা যারা এই ভ্রমণে অংশ নিয়েছিল, এই শোকের মুহূর্তে আমরা তাদের এবং আমাদের পুরো সম্প্রদায়ের পাশে আছি।’ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তার জন্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এদিকে দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পাহাড়ি সড়কের বাঁক, ভোরের সময় কুয়াশা, অথবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। তবে পুলিশ ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না। বাসটির রক্ষণাবেক্ষণ, চালকের বিশ্রাম ও গতিসীমা মানা হয়েছিল কি না—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই দুর্ঘটনা আবারও কলম্বিয়ার পাহাড়ি সড়কে যানবাহন চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দেশটিতে প্রতিবছরই পাহাড়ি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন, যানবাহনের নিয়মিত পরীক্ষা এবং চালকদের প্রশিক্ষণ আরও জোরদার না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে।

শোক আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে অ্যান্টিওকুইয়া অঞ্চল। নিহত শিক্ষার্থীদের অনেকেই জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছিলেন। তাদের স্বপ্ন আর সম্ভাবনা এক মুহূর্তে থেমে যাওয়ায় পুরো দেশই যেন স্তব্ধ। রাষ্ট্রীয়ভাবে নিহতদের স্মরণে শোক পালন এবং পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

মানবিক এই বিপর্যয়ে দেশ-বিদেশের মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হচ্ছে। কলম্বিয়ার এই মর্মান্তিক স্কুলবাস দুর্ঘটনা বিশ্বজুড়ে আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, সড়ক নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি মুহূর্তের দুর্ঘটনা কত অসংখ্য জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত