বিজয় দিবসে গদখালীতে ফুলের বাজারে ৫ কোটির স্বপ্ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
বিজয় দিবসে গদখালী ফুলবাজারে ৫ কোটি টাকার বিক্রির আশা

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মহান বিজয় দিবসকে সামনে রেখে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ফুলের রাজধানী খ্যাত গদখালী এখন রঙিন স্বপ্নে ভরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই যশোর–বেনাপোল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই ফুলবাজারে জমে উঠেছে কেনাবেচার ব্যস্ততা। চারদিকে গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিউলাস আর জারবেরার সুবাসে মুখরিত গদখালী। এবারের বিজয় দিবসে এখানকার ফুলচাষিরা প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য বড় এক আশার বার্তা বহন করছে।

রোববার সকাল থেকেই গদখালীর ফুলবাজারে দেখা যায় ফুলচাষি ও পাইকারদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ মাথায় ঝুড়ি করে ফুল এনেছেন, কেউ ভ্যানে বা ছোট ট্রাকে করে। বাজারজুড়ে দরদাম হাঁকডাক, হাসি আর সন্তুষ্টির দৃশ্য যেন জানান দিচ্ছে—এই মৌসুমে ফুলচাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। বিজয় দিবস উপলক্ষে সারা দেশে স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফুলের চাহিদা বাড়ে কয়েক গুণ। সেই চাহিদার বড় অংশই মেটায় গদখালী।

ঝিকরগাছা ফুলচাষি কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর জানান, এবছর মাঠে গোলাপ ফুলের উৎপাদন কিছুটা কম হলেও বাজারে দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা খুশি। তিনি বলেন, শীতের আগাম প্রভাব ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে কিছু ফুলের উৎপাদন কমেছে, তবে চাহিদা বেশি থাকায় দামও তুলনামূলক ভালো মিলছে। এতে চাষিরা তাদের উৎপাদন খরচ তুলে লাভের মুখ দেখছেন।

যশোর জেলা ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে এবছর প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, শুধু স্থানীয় বাজার নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা গদখালীতে এসে ফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছে এবং কৃষকদের মধ্যে নতুন উদ্যম তৈরি হয়েছে।

গদখালীর পটুয়াপাড়া গ্রামের ফুলচাষি শহিদুল হোসেন জানান, তিনি রডস্টিক এক আঁটি ১০০ থেকে ২০০ টাকা, গোলাপ প্রতি পিস ৬ থেকে ১৩ টাকা এবং গ্লাডিউলাস প্রতি পিস ৮ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, “বছরের এই সময়টা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিজয় দিবস এলেই ফুলের কদর বাড়ে, আর তখনই আমাদের পরিশ্রমের ফলটা পাওয়া যায়।”

অন্যদিকে পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি খোকন জানান, তিনি ১০ কাঠা জমিতে গোলাপ ফুলের চাষ করেছেন। তবে আগাম শীত পড়ায় এবার উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। তবুও দাম ভালো থাকায় তিনি আশাবাদী। তার ভাষায়, “ফুল কম হলেও দাম যদি ভালো থাকে, তাহলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়।”

ফুলবাজারে শুধু চাষিরাই নয়, ব্যাপারীরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন। পটুয়াপাড়া গ্রামের ফুলব্যাপারী ইকবাল হোসেন জানান, তিনি এখান থেকে ফুল কিনে লোহাগড়া ও নড়াইলসহ আশপাশের এলাকায় সরবরাহ করেন। তিনি বলেন, রজনীগন্ধা প্রতি পিস ৭ থেকে ১৪ টাকা, রজনীগন্ধা (ভুট্টা) ১০ থেকে ১৫ টাকা এবং জারবেরা ১৫ থেকে ২০ টাকায় কিনেছেন। এসব ফুল তিনি খুচরা বাজারে আরও বেশি দামে বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।

তবে সব ফুলের দাম সমানভাবে বাড়েনি। গদখালীর মাঠুয়াপাড়া গ্রামের জসিম উদ্দিন জানান, এবছর গাঁদা ফুলের দাম তুলনামূলক কম। তিনি হাজার প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় গাঁদা বিক্রি করেছেন। তার মতে, উৎপাদন বেশি হওয়ায় গাঁদার দাম কিছুটা কমেছে, তবে বিক্রি হচ্ছে নিয়মিত।

ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম জানান, উপজেলায় প্রায় ৬২৮ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করা হয়। গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিউলাস, জারবেরাসহ নানা ধরনের ফুল এখানে উৎপাদিত হয়। তিনি বলেন, কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত মূল্যে ফুল বিক্রি করতে পারায় সন্তুষ্ট। উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে ফুলের উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়।

গদখালী শুধু একটি বাজার নয়, এটি এখন দেশের ফুলশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কয়েক দশক আগে যেখানে অল্প কিছু কৃষক পরীক্ষামূলকভাবে ফুল চাষ শুরু করেছিলেন, সেখানে এখন শত শত পরিবার ফুলচাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই শিল্প স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে এবং যশোরকে দিয়েছে একটি আলাদা পরিচিতি।

বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে ফুলের এই ব্যস্ততা শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, একটি আবেগের সঙ্গেও জড়িত। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ব্যবহৃত প্রতিটি ফুল যেন বহন করে ত্যাগ ও স্বাধীনতার বার্তা। গদখালীর চাষিরা মনে করেন, তাদের উৎপাদিত ফুল দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ দিনে ব্যবহৃত হওয়া এক ধরনের গর্বের বিষয়।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, অনেক তরুণও এখন ফুলচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কেউ পারিবারিক জমিতে নতুন করে ফুল চাষ শুরু করেছেন, কেউ আবার আধুনিক পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল উৎপাদনের পরিকল্পনা করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সংরক্ষণ, পরিবহন ব্যবস্থা ও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানো গেলে গদখালীর ফুলশিল্প আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, মহান বিজয় দিবসকে সামনে রেখে গদখালীর ফুলবাজারে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে, তা শুধু পাঁচ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার গল্প নয়; এটি গ্রামীণ পরিশ্রম, উদ্যোক্তা মনোভাব ও স্বাধীনতার আনন্দের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। ফুলের এই রঙিন উৎসব যেন বিজয়ের আনন্দকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত