প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে যেখানে ব্যাটসম্যানদের দাপটে রানবন্যা বয়ে গিয়েছিল, সেখানে ধর্মশালায় এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখল ক্রিকেটপ্রেমীরা। পাহাড়ঘেরা এই স্টেডিয়ামে বদলে গেল পিচের চরিত্র, বদলে গেল ম্যাচের রং। কিন্তু বদলায়নি ভারতের জয়ের ধারাবাহিকতা। পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেল স্বাগতিক ভারত।
ধর্মশালার হিমেল হাওয়া আর ধীরগতির পিচে টস হেরে আগে ব্যাট করতে নেমেই চাপে পড়ে যায় প্রোটিয়ারা। ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ, সুইং আর স্পিনের মিশ্রণে শুরু থেকেই ব্যাটিং করতে হিমশিম খেতে থাকে দক্ষিণ আফ্রিকা। নির্ধারিত ২০ ওভারে তারা থামে মাত্র ১১৭ রানে। ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এটি দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন সংগ্রহ, যা ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই একপেশে করে দেয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসে একমাত্র উজ্জ্বল নাম এইডেন মার্করাম। চাপের মধ্যেও দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে তিনি করেন ৬১ রান। দলের অন্য ব্যাটসম্যানরা যখন নিয়মিত বিরতিতে উইকেট বিলিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন মার্করাম একপ্রান্ত আগলে রেখে ইনিংস টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাকে কিছুটা সহায়তা করেন দোনোভান ফেরেইরা, যিনি করেন ২০ রান। শেষদিকে হেনরিখ নরকিয়া ১২ রান যোগ করলেও বড় সংগ্রহ গড়ার মতো জুটি গড়ে ওঠেনি।
ভারতের বোলিং আক্রমণ ছিল সুসংগঠিত ও ধারালো। বিশেষ করে হার্দিক পান্ডিয়ার জন্য ম্যাচটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়। দুটি উইকেট নিয়ে তিনি টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে শততম উইকেট পূর্ণ করেন, যা একজন অলরাউন্ডারের জন্য বড় কীর্তি। হার্দিকের পাশাপাশি হার্ষিত রানা, বরুণ চক্রবর্তী ও কুলদীপ যাদব প্রত্যেকে দুটি করে উইকেট শিকার করে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে দেন। স্পিন ও পেসের এই নিখুঁত সমন্বয়ই প্রোটিয়াদের বড় বিপর্যয়ের মূল কারণ।
১১৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত শুরু থেকেই ছিল আত্মবিশ্বাসী। তবে পিচ যে ব্যাটিংয়ের জন্য খুব সহজ নয়, সেটি মাথায় রেখে শুরুতে একটু সতর্ক ব্যাটিং করেন ওপেনাররা। অভিষেক শর্মা ও শুভমান গিলের জুটিতে আসে ৬০ রান, যা ম্যাচের ভিত গড়ে দেয়। অভিষেক শর্মা ৩৫ রান করে আউট হলেও তার ইনিংস ছিল ইতিবাচক ও আগ্রাসী। অন্যদিকে শুভমান গিল করেন ২৮ রান, ইনিংসের গতি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
এরপর সূর্যকুমার যাদব কিছুটা চেষ্টা করলেও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ১২ রান করে ফিরে যান ভারতের এই তারকা ব্যাটসম্যান। তবে তাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়নি। তিলক ভার্মা ও শিভাম দুবে ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাট করে দলকে নিরাপদে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। তিলক ভার্মা অপরাজিত ২৬ রান করেন, অন্যদিকে শিভাম দুবে তার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গ দেন। মাত্র ১৫.৫ ওভারেই লক্ষ্য পূরণ করে নেয় ভারত, যা তাদের দাপুটে জয়ের প্রমাণ।
দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের মধ্যে লুঙ্গি এনগিডি ও মার্কো ইয়ানসেন একটি করে উইকেট নিলেও স্বল্প রানের পুঁজি নিয়ে তারা তেমন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারেননি। ভারতের ব্যাটিং গভীরতা ও ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার দক্ষতার কাছে তারা অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়ে।
এই ম্যাচে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হন আর্শদিপ সিং। নতুন বল ও ডেথ ওভারে তার নিয়ন্ত্রিত বোলিং দক্ষিণ আফ্রিকার রান তোলার গতি আটকে দেয়। চাপের মুহূর্তে উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষমতাই তাকে এই স্বীকৃতি এনে দেয়।
ধর্মশালার এই জয় ভারতের জন্য শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়, বরং সিরিজে মানসিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার বড় উপলক্ষ। প্রথম দুই ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের দাপটের পর এই ম্যাচে বোলাররা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন। এটি ভারতের দলের ভারসাম্য ও গভীরতারই প্রতিফলন।
অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এটি ছিল চিন্তার ম্যাচ। সিরিজের শুরুতে রানবন্যার ম্যাচগুলোতে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও, কঠিন পিচে ব্যাটিং দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে। মিডল অর্ডারের ব্যর্থতা এবং স্পিন মোকাবিলায় অক্ষমতা তাদের বড় ব্যবধানে হার ডেকে এনেছে।
পাঁচ ম্যাচের সিরিজে এখন ভারত ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে। সামনে আরও দুটি ম্যাচ বাকি, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে ব্যাটিং ও বোলিং—দুটো বিভাগেই বড় উন্নতি দেখাতে হবে। আর ভারত চাইবে এই জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সিরিজ নিজেদের করে নিতে।
সব মিলিয়ে ধর্মশালার ম্যাচটি প্রমাণ করে দিল, কন্ডিশন যাই হোক না কেন, বর্তমান ভারতীয় দল পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে জানে। ব্যাটে-বলে সমান দক্ষতা দেখিয়ে তারা যে সিরিজ জয়ের অন্যতম দাবিদার, সেটি আবারও স্পষ্ট হলো এই দাপুটে জয়ের মাধ্যমে।