গুয়াতেমালার আদিবাসী শহরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, নিহত ১৩

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
গুয়াতেমালার আদিবাসী অঞ্চলে সংঘর্ষে ১৩ নিহত, জরুরি অবস্থা

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গুয়াতেমালার আদিবাসী অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলে আবারও রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির সোলোলা বিভাগের নাহুয়ালা শহরে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় মেয়র ম্যানুয়েল গুয়ারচাখ। এই সহিংসতাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার জরুরি অবস্থা জারি করেছে। শত বছরের পুরোনো সীমান্ত বিরোধ, সামরিক উপস্থিতি এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতা—সব মিলিয়ে নাহুয়ালা ও আশপাশের অঞ্চলে উত্তেজনা এখন চরমে।

রাজধানী গুয়াতেমালা সিটি থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত নাহুয়ালা মূলত মায়া জনগোষ্ঠীর বসবাস এলাকা। রোববার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেয়র ম্যানুয়েল গুয়ারচাখ দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আংশিকভাবে দেশটির সেনাবাহিনী দায়ী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুয়াতেমালার সেনাবাহিনী ও পার্শ্ববর্তী সান্তা কাতারিনা ইক্সতাহুয়াকানের কয়েকজন বাসিন্দা একযোগে অতর্কিত হামলা চালায়, যার ফলে ১৩ জন প্রাণ হারান।

মেয়র গুয়ারচাখ জানান, নিহত ব্যক্তিদের বয়স ১৪ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। তারা সবাই স্থানীয় একটি পাথর খনিতে কাজ করছিলেন, এমন সময় তাদের ওপর হামলা হয়। তিনি নিহতদের নাম ও বয়স নিজে পড়ে শুনিয়ে বলেন, এই তথ্য কোনোভাবেই মনগড়া নয়, বরং স্থানীয় প্রশাসনের যাচাই করা তথ্য। এই ঘটনার পর নাহুয়ালায় দুই দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। রোববার থেকেই নিহতদের দাফন ও শেষকৃত্যের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যেখানে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো শহর।

নাহুয়ালা ও সান্তা কাতারিনা ইক্সতাহুয়াকান—এই দুই আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নতুন নয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই বিরোধ চলে আসছে। জমির মালিকানা, বনাঞ্চল ও পানিসম্পদ সংরক্ষিত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে অতীতেও একাধিকবার প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যকর মধ্যস্থতা ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অভাবই এই সহিংসতাকে বারবার উসকে দিচ্ছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট বার্নার্দো আরেভালো রোববার সোলোলা বিভাগে বিশেষ প্রতিরোধমূলক জরুরি অবস্থা জারি করেন। ‘স্টেট অব প্রিভেনশন’ নামে পরিচিত এই জরুরি অবস্থা ১৫ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। এর আওতায় ওই অঞ্চলে সমাবেশ, বিক্ষোভ এবং চলাচলের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট আরেভালো বলেন, সোলোলা বিভাগ ও দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা বর্তমানে এক সংকটজনক পরিস্থিতির মুখে। তার অভিযোগ, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রগুলো পরিকল্পিতভাবে এই অঞ্চলে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য সেনাবাহিনীকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা, যাতে তারা নির্বিঘ্নে চাঁদাবাজি, অবৈধ খনন ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। প্রেসিডেন্টের মতে, এই সহিংসতার পেছনে কেবল সম্প্রদায়গত দ্বন্দ্ব নয়, বরং সুসংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, চলতি সপ্তাহের শুরুতে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে টানা ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় একটি সামরিক চৌকিতে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় সাতজন সেনা সদস্য আহত হন। প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেন, এটি কোনো সম্প্রদায়গত সংঘর্ষ ছিল না; বরং সেনাবাহিনীর ওপর একটি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত আক্রমণ ছিল।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

এর আগেও সহিংসতা থামেনি। বৃহস্পতিবার নাহুয়ালা ও সান্তা কাতারিনা ইক্সতাহুয়াকানের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় চারজন সেনা আহত হন। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে অনেক সময় আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। অপরদিকে সরকার দাবি করছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামরিক উপস্থিতি এখন অপরিহার্য।

এই অঞ্চল অতীতেও একাধিকবার সহিংসতার সাক্ষী হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে একই ধরনের এক ভয়াবহ সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে তিনজন শিশু এবং একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। সে সময়ও সরকার জরুরি অবস্থা জারি করেছিল এবং সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না আসায় সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার, নিরাপত্তা ও জীবিকা সুরক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই এই সহিংসতার মূল কারণ। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন।

নাহুয়ালার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি স্থানীয় সংঘর্ষ নয়; এটি গুয়াতেমালার আদিবাসী অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন। জরুরি অবস্থা সাময়িকভাবে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু টেকসই শান্তির জন্য প্রয়োজন সংলাপ, ন্যায়বিচার এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারকে সম্মান করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। না হলে এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় আরও দীর্ঘ হতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত