প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউরোপজুড়ে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনে লন্ডনের রাস্তায় হাজার হাজার উগ্র অভিবাসীবিরোধী নাগরিক সমাবেশে অংশ নেন। তারা ব্রিটেনে এসে নাগরিকত্ব পাওয়া বিভিন্ন জাতির লোকদের উদ্দেশ্যে ‘তাদের বের করে দাও’, ‘তাদের ঘরে পাঠাও’ এবং ‘আমরা আমাদের দেশ ফেরত চাই’ এর মতো স্লোগান দেন।
সমাবেশে অংশ নেওয়া এক পার্লামেন্ট সদস্য অভিযোগ করেন, ব্রিটিশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোতে এখন প্রচুর অশেতাঙ্গ মুখ দেখা যাচ্ছে এবং তিনি ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ বা নাগরিকত্ব পাওয়া কিছু ব্যক্তিকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন। এই ধরনের মনোভাব শুধু ব্রিটেনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জার্মানির এএফডি, ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি ও হাঙ্গেরির ফিডেস পার্টির মতো রাজনৈতিক দলগুলোও অভিবাসীদের উপর চাপ প্রয়োগ ও বহিষ্কারের দাবি তুলছে। তারা অভিবাসনকে জাতীয় পরিচিতির জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করছে।
একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইউরোপের অভিবাসীবিরোধী দল ও সংগঠনগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। তিনি সোমালিয়া থেকে আসা কিছু অভিবাসীকে ‘আবর্জনা’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে অভিবাসীবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এর ফলে ইউরোপের কিছু মূলধারার রাজনৈতিক দলও এই অবস্থানকে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু ক্ষেত্রে বিভাজক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
ব্রিটেনের বেলফাস্টের কুইনস বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিটিশ ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষক কিরেন কনেল বলেন, “একসময় উগ্রতা রক্ষণশীল দলগুলোর মধ্যেই সীমিত ছিল, এখন তা রাজনৈতিক বিতর্কের মূল অংশ হয়ে উঠেছে।” বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়া, বিশেষত আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউক্রেন থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের আগমন, সামাজিক এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। যদিও মোট অভিবাসনের একটি ছোট অংশই আশ্রয়প্রার্থী, তবুও বিভিন্ন কারণে বৈচিত্র ও অভিবাসনের বিরুদ্ধে মনোভাব তৈরি হয়েছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের পলিসি ইউনিটের ডিরেক্টর ববি ডাফি বলেন, “ব্রিটেনে জাতিগত স্বতন্ত্রতার ধারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে লোকজন উগ্র রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে। অর্থনৈতিক সংকট, ব্রেক্সিট এবং কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব এই মনোভাবকে আরও জোরালো করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই মনোভাব প্রচারিত হচ্ছে।”
ইউরোপজুড়ে উগ্র রক্ষণশীল দলগুলো যেমন ব্রিটেনের রিফর্ম ইউকে, জার্মানির এএফডি, ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি এবং হাঙ্গেরির ফিডেস পার্টি নৃতাত্ত্বিক জাতি বিভেদের প্রচারণা চালিয়েছে, সেই মনোভাব এখন মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও প্রবেশ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি অনুযায়ী ইউরোপ অভিবাসনের কারণে ‘অর্থনৈতিক পতন’ ও ‘সভ্যতার বিলোপ’ হুমকির মুখে।
ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালির নেতা জর্ডান বারডেলা বিবিসিকে বলেছেন, “বিপুল অভিবাসনের কারণে ইউরোপের দেশগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ট্রাম্পের শঙ্কার সঙ্গে আমরা একমত।” ব্রিটেনের রিফর্ম ইউকে দল বলছে, ক্ষমতায় এলে তারা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বিলুপ্ত করবে, যদিও অনেক অভিবাসী দশকের পর দেশটিতে বসবাস করছেন। রক্ষণশীল কনজারভেটিভ পার্টি জানাচ্ছে, অপরাধে জড়িত দ্বি-নাগরিকত্বপ্রাপ্ত নাগরিকদের তারা বহিষ্কার করবে।
এদিকে কৃষ্ণাঙ্গ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য ডন বাটলার উল্লেখ করেছেন, “পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা ও মৃত্যুর হুমকিও বেড়েছে।” ব্রিটিশ পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে এক লাখ ১৫ হাজার ঘৃণামূলক অপরাধ (হেট ক্রাইম) রেকর্ড করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি।
তবে এর বিপরীতে মূলধারার অনেক রাজনীতিবিদ এই মনোভাবের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি জাতিগত বিদ্বেষের নিন্দা জানিয়েছে এবং জানিয়েছে, অভিবাসন ব্রিটেনের জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।