প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বিজয় দিবস উপলক্ষে নৌবাহিনীর ২০ অফিসারকে অনারারি কমিশন প্রদান বাংলাদেশের সামরিক ঐতিহ্য, পেশাদারিত্ব ও দীর্ঘদিনের নিষ্ঠার প্রতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির এক গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মহান বিজয় দিবস ও জাতীয় দিবসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২০ জন মাস্টার চিফ পেটি অফিসার পদমর্যাদার জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারকে অনারারি সাব-লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন প্রদান করা হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এই কমিশন কার্যকর হবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিজয়ের মাসে এমন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, তাদের পরিবার এবং পুরো নৌবাহিনীর জন্য গর্বের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামরিক কাঠামোয় অনারারি কমিশন একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি, যা সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের দেওয়া হয়। মাস্টার চিফ পেটি অফিসাররা নৌবাহিনীর কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। তারা শুধু কারিগরি ও প্রশাসনিক দায়িত্বই নয়, বরং অধস্তন সদস্যদের প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব ও মনোবল বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই বিজয় দিবসের প্রাক্কালে তাদের অনারারি সাব-লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন দেওয়া হলো।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, এই কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দীর্ঘ কর্মজীবনে নৌবাহিনীর বিভিন্ন জাহাজ, ঘাঁটি ও দপ্তরে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমুদ্রসীমা রক্ষা, নৌ নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন বলেও প্রজ্ঞাপনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
অনারারি কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. হুমায়ুন কবির, মো. গিয়াস উদ্দিন, এ এস এম জামিউল আজিম, মো. আবু ইউসুফ, মো. মোশারফ হোসেন খান, মো. মোজাম্মেল হক, কে বি এম নূরুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন, মো. আব্দুল ওয়াহেদ, মো. নুরুল ইসলাম, মো. মোখলেছুর রহমান, মোহাম্মদ হাছান, সৈয়দ খালেদ রানা, মো. খায়রুজ্জামান, এ কে এম কামাল উদ্দিন, এস এম হাসিয়ার, মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম মীর, মো. আয়নাল হক ভূঞা, মো. মাহমুদুল হাসান এবং হারুন অর রশিদ। তারা প্রত্যেকে নৌবাহিনীর বিভিন্ন শাখায় দায়িত্ব পালন করে পেশাগত দক্ষতা ও শৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
বিজয় দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় দিনগুলোর একটি। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই দিনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্মাননা, পদক ও পদোন্নতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তুলে ধরা হয়। নৌবাহিনীর ২০ কর্মকর্তাকে অনারারি কমিশন প্রদান সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
নৌবাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনারারি সাব-লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন পাওয়া কর্মকর্তারা ভবিষ্যতেও নৌবাহিনীর শৃঙ্খলা ও ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। যদিও এটি মূলত সম্মানসূচক পদ, তবে এর মাধ্যমে বাহিনীর অভ্যন্তরে কর্মস্পৃহা ও পেশাদারিত্ব আরও বাড়ে। অধস্তন সদস্যদের জন্য এটি অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে, কারণ তারা দেখতে পান যে দীর্ঘদিনের সৎ ও নিষ্ঠাবান সেবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, অনারারি কমিশন প্রদানের এই প্রথা বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে করে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও পেশাগত গর্ব আরও দৃঢ় হয়। একই সঙ্গে এটি তরুণ সদস্যদের জন্য একটি বার্তা দেয় যে সঠিক পথে দায়িত্ব পালন করলে রাষ্ট্র কখনো অবদান ভুলে যায় না।
এদিকে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিবারগুলোর মধ্যেও আনন্দ ও আবেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবারই জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন প্রিয়জনকে সমুদ্র ও দায়িত্বের কঠোর বাস্তবতায় কাজ করতে দেখেছেন তারা। বিজয় দিবসের মতো একটি ঐতিহাসিক দিনে এই স্বীকৃতি তাদের ত্যাগ ও অপেক্ষারও মূল্যায়ন।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী বর্তমানে শুধু দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষায় নয়, বরং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশন, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বাহিনীর দক্ষ ও অভিজ্ঞ সদস্যদের সম্মানিত করা বাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতা ও ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করে। অনারারি কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নাবিকদের অনুপ্রাণিত করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।