বিপজ্জনক বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত দিল্লি, বাতিল ৪০ ফ্লাইট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২৫ বার

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

দিল্লিতে বিপজ্জনক বায়ুদূষণ আবারও রাজধানীজুড়ে আতঙ্ক ও অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে, যেখানে ঘন ধোঁয়াশা, বাতাসে বিষাক্ত কণার আধিক্য এবং দৃশ্যমানতার মারাত্মক অবনতি নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

ভারতের রাজধানী দিল্লি ও আশপাশের এনসিআর অঞ্চলে সোমবার সকাল থেকেই বায়ুদূষণের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের আকাশ ঢেকে যায় ঘন ধোঁয়ায়। প্রধান সড়ক, উড়ালপথ, আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে দৃশ্যমানতা এতটাই কমে যায় যে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিমান ও রেল যোগাযোগে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দূষণ ও কুয়াশার কারণে অন্তত ৪০টি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে এবং তিন শতাধিক ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে ছেড়েছে।

ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোর থেকে বিমানবন্দরের টার্মিনালগুলোতে অপেক্ষমাণ যাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। অনেক যাত্রী টিকিট কেটে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার হতাশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফ্লাইটের নতুন সময়সূচির অপেক্ষায় ছিলেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, দৃশ্যমানতা নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ায় অবতরণ ও উড্ডয়ন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, ফলে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

শুধু বিমান চলাচল নয়, দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় রেল যোগাযোগেও বিঘ্ন ঘটে। উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে দিল্লিগামী ও দিল্লি থেকে ছেড়ে যাওয়া একাধিক ট্রেন নির্ধারিত সময়ে চলতে পারেনি। অনেক ট্রেন ধীরগতিতে চলেছে, আবার কিছু ট্রেন নির্দিষ্ট স্টেশনে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। যাত্রীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৬টায় দিল্লির গড় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই ছিল ৪৫৬, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘বিপজ্জনক’ স্তরে পড়ে। এই মাত্রার বায়ু শ্বাস নেওয়া সুস্থ মানুষের জন্যও ক্ষতিকর, আর শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের জন্য তা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। এর আগের দিন রবিবারও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ; সেদিন একিউআই ৪৬১ রেকর্ড করা হয়।

দূষণের এমন চরম মাত্রার কারণে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা হিসেবে অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি করেছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বাতাসের গতি কম থাকায় এবং তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে নিচে নামায় দূষিত কণাগুলো বাতাসে আটকে আছে। ফলে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ দূষণ সরিয়ে নিতে পারছে না। এ অবস্থায় কয়েকদিন ধরে পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

দিল্লির বায়ুদূষণের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। শীতকালে খড় পোড়ানো, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা এবং শিল্পকারখানার নির্গমন মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দূষণ পরিস্থিতিতে সামান্য উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। আবারও ঘন ও বিষাক্ত ধোঁয়া শহরের বড় অংশকে গ্রাস করেছে।

এই দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, শ্বাসকষ্ট, চোখে জ্বালা, গলা ব্যথা ও মাথাব্যথার রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রজনিত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। চিকিৎসকরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন।

শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে উদ্বিগ্ন। যদিও কর্তৃপক্ষ এখনো সব স্কুল বন্ধের ঘোষণা দেয়নি, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অনলাইন ক্লাস বা সাময়িক ছুটি দেওয়ার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় রয়েছে। খোলা মাঠে খেলাধুলা ও শরীরচর্চা বন্ধ রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিল্লির বায়ুদূষণ এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর শীত মৌসুম এলেই একই চিত্র ফিরে আসে, কিন্তু কার্যকর ও সমন্বিত সমাধানের অভাবে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হচ্ছে না। তারা মনে করছেন, শুধু জরুরি সতর্কতা বা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং পরিবহন ব্যবস্থা, জ্বালানি ব্যবহার, কৃষি কার্যক্রম এবং নগর পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি।

পরিবেশবিদদের মতে, দিল্লির মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এই মাত্রার দূষণ শুধু ভারতের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশগত সংকটের প্রতিফলন। প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই আঞ্চলিক সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত