ক্লাব-বোর্ড দ্বন্দ্বে ‘খুন’ হচ্ছে দেশের ক্রিকেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
ক্লাব বোর্ড দ্বন্দ্ব ক্রিকেট

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

১৪ ডিসেম্বর রোববার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ। ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্যালেন্ডারে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক আয়োজন, যেখানে দেশের অসংখ্য উদীয়মান ক্রিকেটারের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। কিন্তু সেই লিগ দুই দিনের মধ্যেই কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৫ ডিসেম্বর সোমবার সূচি অনুযায়ী পাঁচটি ম্যাচ হওয়ার কথা থাকলেও মাঠে গড়ায় মাত্র একটি। ওই রাতেই ঘোষণা আসে—লিগ স্থগিত। পরবর্তী রাউন্ডের খেলা আপাতত আর হচ্ছে না।

এই দুই দিনের ক্রিকেটে মাঠের পারফরম্যান্স, হার-জিত, ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি কিংবা উইকেট শিকারের গল্প প্রায় আড়ালেই থেকে যায়। আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে লিগ বর্জন, ওয়াকওভার, সংগঠক ও বোর্ডের দ্বন্দ্ব এবং ক্রিকেটারদের হতাশা ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট আবারও প্রমাণ করে দিল, মাঠের বাইরের ক্ষমতার লড়াই কীভাবে মাঠের ভেতরের খেলাটাকে গ্রাস করে নেয়।

এই সংকটের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ক্লাব সংগঠক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালকদের মধ্যে তীব্র বিরোধ। একসময় যারা একই টেবিলে বসে ক্রিকেট নিয়ে আড্ডা দিতেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাগাভাগি করতেন, তারাই আজ পরস্পরের নাম শুনতেও অনিচ্ছুক। ক্ষমতার চেয়ার আর কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব সম্পর্কের জায়গা থেকে নৈতিকতার ন্যূনতম সীমারেখাকেও মুছে দিয়েছে। ক্রিকেট এখানে আর খেলা নয়, হয়ে উঠেছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার।

এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত বিসিবির সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ঘিরে। ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনকে ঘিরে উঠেছে অস্বচ্ছতা, ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রভাব এবং ই-ভোটিং জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ। দেশের ৪৪টি ক্লাব প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই নির্বাচনকে বৈধ মনে করে না। তাদের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়ায় যারা নিজেদের নির্বাচিত দাবি করছেন, তারা অবৈধ এবং এমন বোর্ডের অধীনে তারা কোনো ধরনের ক্রিকেটে অংশ নেবে না।

প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগের ২০টি ক্লাবের মধ্যে আটটি ক্লাব এই অবস্থানের প্রতিফলন ঘটিয়ে সরাসরি লিগ বর্জন করে। বিসিবি পাল্টা অবস্থান নেয়। অভিযোগ উপেক্ষা করেই ১২ দল নিয়ে লিগ শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড। বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে, আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে লিগ শুরুর মাধ্যমে বিসিবি দেখাতে চেয়েছিল, তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু বাস্তবতা দুই দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়। নির্ধারিত ১০ ম্যাচের মধ্যে মাত্র তিনটি আয়োজন করতে পেরেই লিগ স্থগিত করতে বাধ্য হয় বোর্ড। বার্তাটি পরিষ্কার—এভাবে ক্রিকেট চলে না।

বিধিবিধান অনুযায়ী লিগ বর্জনকারী ক্লাবগুলোর অবনমন হওয়ার কথা, তাদের দ্বিতীয় বিভাগে নামিয়ে দেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সেটি যে সমস্যার সমাধান নয়, বরং সংকট আরও ঘনীভূত করবে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত হয়তো সাময়িকভাবে কর্তৃত্ব দেখাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোকে আরও দুর্বল করবে।

এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ক্রিকেটাররা। ক্লাব সংগঠকরা দাবি করেন, তারাই ক্রিকেটার তৈরি করেন, তারাই ক্রিকেটের বড় স্টেকহোল্ডার। বিসিবির পরিচালকদের একটি অংশ কিছুদিন আগেও এই সংগঠকদের বন্ধু ছিলেন, আজ তারা ক্ষমতার আসনে বসে সেই সম্পর্ককে অস্বীকার করছেন। এই দ্বন্দ্বের ফাঁদে পড়ে ক্রিকেটাররা হয়ে উঠেছেন নিছক বলি।

প্রথম বিভাগের ২০ দলের মধ্যে আটটি ক্লাব লিগ বর্জন করেছে। এই সংখ্যা দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রবল। ঘরোয়া ক্রিকেটের এই স্তরগুলোই বাংলাদেশের ক্রিকেটের শেকড়। এখান থেকেই উঠে আসে জাতীয় দলের সম্ভাবনাময় মুখগুলো। এই কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়বে। তখন জাতীয় দল টিকিয়ে রাখতে কৃত্রিম লাইফ সাপোর্ট দিলেও তৃণমূল থেকে নতুন প্রতিভা উঠে আসবে না।

লিগ না হলে ক্রিকেটারদের আয়ের পথ সংকুচিত হয়। অনেকের জন্য ঘরোয়া লিগই একমাত্র আয়ের উৎস। ম্যাচ না থাকলে তারা কোথায় খেলবেন, কীভাবে নিজেদের পারফরম্যান্স দেখাবেন—এই প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব নেই। অথচ এই ক্রিকেটারদের একমাত্র ‘দোষ’ হলো, তারা ক্রিকেট খেলতে চায়।

এই পরিস্থিতিকে অনেকেই তুলনা করছেন যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে। সেখানে ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ‘কোলাটেরাল ড্যামেজ’, অর্থাৎ আনুষঙ্গিক ক্ষতি। যুদ্ধের মূল লক্ষ্য না হয়েও নিরীহ মানুষ বা সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিসিবি ও ক্লাব সংগঠকদের এই ক্ষমতার যুদ্ধে সেই কোলাটেরাল ড্যামেজ এখন ক্রিকেটাররা। তারা কোনো পক্ষের ক্ষমতার অংশ নয়, তবু ফল ভোগ করছে তারাই।

প্রশ্ন উঠছে, কার স্বার্থে এই সংঘাত? উভয় পক্ষই মুখে বলছে, তারা ক্রিকেট ভালোবাসে। কিন্তু সেই ভালোবাসার আড়ালে যদি থাকে চেয়ার আঁকড়ে রাখার চেষ্টা, জমিদারি মানসিকতা, জালিয়াতি ও প্রভাব খাটানোর প্রবণতা, তাহলে ক্রিকেট কেবল একটি মুখোশে পরিণত হয়। ব্যক্তিগত ক্ষমতার পথ পরিষ্কার করতেই যদি ক্রিকেট ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই ‘ভালোবাসা’ নিছক স্লোগান ছাড়া কিছু নয়।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত অধঃপতন ডেকে আনে। প্রশাসনিক লড়াই, ব্যক্তিগত ইগো আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যখন খেলাটার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন মাঠে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়। আজ প্রথম বিভাগ লিগের এই অচলাবস্থা তারই প্রমাণ।

সমাধান একতরফা জেদে নয়, সংলাপে। ক্লাব সংগঠক ও বোর্ড—উভয় পক্ষকেই বুঝতে হবে, ক্রিকেট তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি লাখো ক্রিকেটার ও সমর্থকের স্বপ্নের জায়গা। সেই স্বপ্ন ভাঙলে দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই। যদি এখনই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত না আসে, তাহলে আজ প্রথম বিভাগ, কাল পুরো ঘরোয়া ক্রিকেট—সবকিছুই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত