হাদি হত্যাচেষ্টা: সাভারে রিসোর্টে সাড়ে তিন ঘণ্টার রহস্যময় বৈঠক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮১ বার
হাদি হত্যাচেষ্টা: সাভারে রিসোর্টে সাড়ে তিন ঘণ্টার রহস্যময় বৈঠক

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সাভারের একটি রিসোর্টে সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী গোপন বৈঠক হয়েছে—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে গোয়েন্দা সূত্রে। এই তথ্য সামনে আসার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি এখন একটি গুরুতর হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত শুক্রবার ভোরে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের গ্রিন জোন রিসোর্টে এই গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভোর ৫টা ২৩ মিনিট থেকে সকাল ৮টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত রিসোর্টের একটি কক্ষে বৈঠকটি চলে। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার এই বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, তা এখন তদন্তকারীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার একটি সুপরিকল্পিত ছক তৈরি করা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই বৈঠকের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল তারও আগে। বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক তিনটার দিকে মিরপুরের আলমগীর হোসেন গ্রিন জোন রিসোর্টে যোগাযোগ করে ২০৪ নম্বর কক্ষটি বুকিং দেন। বুকিংয়ের সময় রিসোর্টের নাইট ডিউটিরত কর্মী হাবিবুর রহমান সিয়ামের সহায়তা নেওয়া হয়। এরপর রাত চারটা আট মিনিটে আলমগীর হোসেনের পরিচয়ে দুই নারী ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর, ভোর পাঁচটা ২৫ মিনিটে আলমগীর হোসেন আরও একজনকে সঙ্গে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। সকাল আটটা ২৫ মিনিটে চারজন একসঙ্গে কক্ষ ত্যাগ করেন।

রিসোর্টের সিসিটিভি ফুটেজে তাদের যাতায়াতের স্পষ্ট দৃশ্য ধারণ হয়েছে। সেই ফুটেজ ও ভিডিও ক্লিপ ইতোমধ্যে সাংবাদিকদের হাতে এসেছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও সরবরাহ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এই সিসিটিভি ফুটেজ মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এতে বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের গতিবিধি ও সময়কাল স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণে জানা যায়, ওই সময় কক্ষে উপস্থিত ছিলেন হাদি হত্যাচেষ্টায় জড়িত কথিত কিলিং মিশনের প্রধান শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান, তার বান্ধবী মারিয়া, আলমগীর হোসেন এবং আরও একজন সহযোগী। সূত্রের দাবি, এই চারজনই বৈঠকে হাদিকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকের সময় মোবাইলে ধারণ করা অডিও রেকর্ডিংও গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনার বিস্তারিত আলাপ উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, এই অডিও রেকর্ডিং ও সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে পুরো ঘটনার একটি সময়রেখা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এই পরিকল্পনার পেছনে আরও কারা জড়িত ছিল এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না।

এই ঘটনায় গত ১৩ ডিসেম্বর মারিয়াকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে, যদিও তদন্তের স্বার্থে সেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। মারিয়ার ভূমিকা কতটা সক্রিয় ছিল এবং তিনি কেবল সহযোগী নাকি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন—তা খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

গ্রিন জোন রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রিসোর্ট পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন কক্ষ ও আশপাশের এলাকা তল্লাশি চালান। রিসোর্টের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তের স্বার্থে তাদের দুটি সিসিটিভি ফুটেজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, রুম সার্ভিসবয় হাবিবুর রহমান সিয়ামকে র‌্যাব জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এই হত্যাচেষ্টা পরিকল্পনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর ইনকিলাব মঞ্চের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার ওপর সরাসরি হামলার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত চালাচ্ছেন। প্রমাণ সংগ্রহ, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি বিশ্লেষণ এবং যোগাযোগের সূত্রগুলো যাচাই করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনার পেছনে অর্থের যোগান, নির্দেশদাতা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না—সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা সংগঠনিক বিরোধ যদি সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আশা করছে, অডিও রেকর্ডিং, সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খুব শিগগিরই পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচন করা সম্ভব হবে। এই হত্যাচেষ্টা পরিকল্পনা কেবল একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত