প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় টানা এক সপ্তাহ ধরে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করছে, যা স্থানীয় জনগণ ও কৃষি কর্মকাণ্ডের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ডও দীর্ঘদিন ধরে এই উপজেলায়ই হচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, চলমান শৈত্যপ্রবাহে দিনের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকলেও রাত ও ভোরে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে, যা তেঁতুলিয়ার মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৭ ডিসেম্বর বুধবার সকাল ৯টায় তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৭১ শতাংশ। এর আগে মঙ্গলবার ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় তাপমাত্রা ছিল ৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই দিন বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৭৪ শতাংশ এবং বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৯ থেকে ১০ কিলোমিটার। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৭.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পূর্ববর্তী দিন, ১৫ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই দিন বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৮৯ শতাংশ এবং বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯–১০ কিলোমিটার। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শৈত্যপ্রবাহের ফলে রাতের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় স্থানীয় মানুষজন সকাল ও রাতের সময় ঠান্ডা থেকে রক্ষা পেতে অতিরিক্ত কাপড় ও গরম পানির ব্যবহার বাড়িয়েছে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, ১১ ডিসেম্বর থেকে উপজেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, শৈত্যপ্রবাহে রাত ও ভোরের তাপমাত্রা কম থাকলেও দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকে। তাপমাত্রার এই বৈচিত্র্য স্থানীয় কৃষি কার্যক্রম এবং জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে শীতকালীন ফসল, পশুপালন ও পরিবহন খাতে শৈত্যপ্রবাহের কারণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সকাল ও রাতের সময় বাতাসে শৈত্যের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ঘুমের গুণগত মানও কমে যাচ্ছে। মানুষজন রোদ ওঠার আগেই ঘরের ভিতর থেকে বাইরে বের হয় না। অনেকেই শীতজনিত অসুস্থতার শিকার হচ্ছেন, যার মধ্যে সর্দি-কাশি, জ্বর ও ঠান্ডাজনিত ফ্লু’র মতো সমস্যা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়া শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য শৈত্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
শৈত্যপ্রবাহের এই অবস্থা কৃষকদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। শীতকালীন সবজি চাষে প্রভাব পড়ছে। তেঁতুলিয়ার কৃষকরা জানিয়েছেন, ফসলের ক্ষতি এড়াতে তাঁরা রাতের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওপর বিশেষ নজর রাখছেন। তাঁরা শীতকালীন ফসলের জন্য গাছপালার চারপাশে মাটির চাদর ব্যবহার করছেন এবং রাতের সময় গাছের ওপর জল ছিটাচ্ছেন যাতে শীতের কারণে ফসলের ক্ষতি কম হয়।
আবহাওয়াবিদরা আরও জানিয়েছেন, শৈত্যপ্রবাহের সময় এই অঞ্চলে বাতাসের আর্দ্রতা কিছুটা বেশি থাকে, যা মানুষের ত্বক ও শ্বাসপ্রশ্বাসে প্রভাব ফেলে। তাই স্থানীয়দের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, সকাল ও রাতে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখা এবং বাইরে গেলে গরম কাপড় ব্যবহার করা। এছাড়া হালকা ব্যায়াম ও গরম পানির ব্যবহার শৈত্যপ্রবাহ মোকাবেলায় কার্যকর বলে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
স্থানীয় প্রশাসনও মৃদু শৈত্যপ্রবাহকে মাথায় রেখে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে। শীতকালীন অসুস্থতা প্রতিরোধ, শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পশুপালনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নজরদারি রাখতে স্থানীয় স্বাস্থ্য ও কৃষি বিভাগ সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালীন এই শৈত্যপ্রবাহ তেঁতুলিয়া এবং পঞ্চগড়ের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য স্বাভাবিক আবহাওয়ার অংশ, তবে দীর্ঘস্থায়ী হলে জনজীবন, পরিবহন, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তাই স্থানীয় প্রশাসন ও মানুষদের পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টানা এক সপ্তাহের এই মৃদু শৈত্যপ্রবাহ এবং দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করছে, শীতকাল এই অঞ্চলে এখনও প্রবল প্রভাব রাখছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তাপমাত্রার আরও কিছুটা পতন হতে পারে, তাই জনসাধারণকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে, তেঁতুলিয়ার মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুধু আবহাওয়ার দিক থেকে নয়, স্থানীয় জীবনধারা, কৃষি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখানকার মানুষজন এই শীতকে স্বাভাবিকভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা করছেন, তবে দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে তা স্থানীয় জীবন ও অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।