প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) ইতিহাসে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ বরাবরই আলোচনার বিষয়। তবে এবারের আসরে সেই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে টাইগার পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে। নিলাম থেকে রেকর্ড দামে কেনা এই বাঁহাতি পেসারকে নিয়ে শুরুতে কিছুটা শঙ্কায় পড়েছিল তার নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সেই দুশ্চিন্তার অবসান ঘটেছে। প্রায় পুরো আইপিএল মৌসুমেই মোস্তাফিজকে অনাপত্তিপত্র বা এনওসি দিচ্ছে বিসিবি—এ কথা নিশ্চিত করেছেন ক্রিকেট অপারেশন্স বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন ফাহিম।
আগামী বছরের ২৬ মার্চ পর্দা উঠবে আইপিএলের ১৯তম আসরের। প্রায় দুই মাসব্যাপী এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ৩১ মে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে এবার একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে অংশ নেবেন মোস্তাফিজুর রহমান। আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে দলে ভিড়িয়েছে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে, যা আইপিএল ইতিহাসে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য। এই অঙ্ক শুধু মোস্তাফিজের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও এক গর্বের অধ্যায়।
তবে এত বড় বিনিয়োগের পরও কলকাতার শিবিরে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কারণ, আইপিএলের সময়সূচির সঙ্গে প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশের ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ খেলার কথা রয়েছে। ওই সিরিজে তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ম্যাচ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য হিসেবে মোস্তাফিজের সেখানে অংশগ্রহণ প্রায় নিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছিল। সেক্ষেত্রে আইপিএলের বেশ কয়েকটি ম্যাচে তাকে পাওয়া যাবে না—এমন শঙ্কাই দেখা দিয়েছিল।
কিন্তু বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় দলের প্রয়োজন এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলোয়াড়ের দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নাজমূল আবেদীন ফাহিম জানিয়েছেন, আইপিএলের সময়সূচির মধ্যে কেবল ৮ থেকে ১০ দিনের জন্য মোস্তাফিজ বাংলাদেশে ফিরবেন। ওই সময়ের মধ্যে ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টির যেকোনো একটি সিরিজ খেলেই তিনি আবার ভারতে ফিরে যাবেন। অর্থাৎ পুরো মৌসুম না হলেও প্রায় পুরো আইপিএলেই কলকাতার হয়ে মাঠে দেখা যাবে ‘কাটার মাস্টার’কে।
এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরেছে কলকাতা নাইট রাইডার্স শিবিরে। দলটির টিম ম্যানেজমেন্ট শুরু থেকেই মোস্তাফিজকে মৌসুমজুড়ে পেতে আগ্রহী ছিল। বিশেষ করে আইপিএলের শেষ ভাগে, যেখানে প্লে-অফ ও ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক বোলারের উপস্থিতি দলের জন্য বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। মোস্তাফিজের কাটার, স্লোয়ার ও ডেথ ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিং যে কোনো দলের ব্যাটিং লাইনআপের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
মোস্তাফিজ নিজেও নতুন এই যাত্রা নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। নিলামের দিন রাতেই কলকাতা নাইট রাইডার্সের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। সেখানে টাইগার পেসার বলেন, কেকেআর পরিবারের অংশ হতে পেরে তিনি খুবই আনন্দিত এবং শিগগিরই সমর্থকদের সঙ্গে মাঠে দেখা হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তার এই বার্তায় কলকাতার সমর্থকদের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া পড়ে।
আইপিএলে মোস্তাফিজের অভিজ্ঞতা নতুন নয়। এর আগে আটটি মৌসুমে তিনি পাঁচটি ভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছেন। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে আইপিএল জয়ের স্বাদ যেমন পেয়েছেন, তেমনি রাজস্থান রয়্যালস, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, দিল্লি ক্যাপিটালস ও চেন্নাই সুপার কিংসের মতো দলের জার্সিতেও মাঠে নেমেছেন। প্রতিটি দলেই তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন, বিশেষ করে বিদেশি কন্ডিশনে স্লোয়ার আর কাটারের নিখুঁত ব্যবহারে।
কলকাতা নাইট রাইডার্সের জার্সিতে খেলাটা মোস্তাফিজের জন্য আরেকটি নতুন অধ্যায়। এই ফ্র্যাঞ্চাইজিতে এর আগে বাংলাদেশের তিন তারকা ক্রিকেটার খেলেছেন। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, সাকিব আল হাসান ও লিটন দাস একসময় কলকাতার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন মোস্তাফিজ। ফলে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য কলকাতার ম্যাচগুলো বাড়তি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কলকাতার পেস আক্রমণে মোস্তাফিজ বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। ইডেন গার্ডেন্সের উইকেটে নতুন বলে যেমন সুইং পাওয়া যায়, তেমনি পুরোনো বলে কাটার ও স্লোয়ার কার্যকর হয়। এই কন্ডিশনে মোস্তাফিজের বোলিং বৈচিত্র্য কলকাতাকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এগিয়ে রাখতে পারে। একই সঙ্গে আইপিএলের মতো মঞ্চে প্রায় পুরো মৌসুম খেলার সুযোগ পাওয়া তার আত্মবিশ্বাস ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে, বিসিবির সিদ্ধান্তে জাতীয় দল ও ফ্র্যাঞ্চাইজি—দু’পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা হয়েছে। মোস্তাফিজ জাতীয় দলের হয়ে সীমিত সময় দায়িত্ব পালন করে আবার আইপিএলে ফিরবেন। আর কলকাতা নাইট রাইডার্সও তাদের রেকর্ড দামে কেনা তারকাকে মৌসুমের বড় অংশে পাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্যও এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর, কারণ আইপিএলের মঞ্চে আবারও নিয়মিত দেখা যাবে দেশের অন্যতম সফল এই পেসারকে।