প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এক স্বস্তির খবরের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান। আসন্ন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে প্রায় পুরো মৌসুম কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে অনাপত্তি সনদ পেয়েছেন তিনি। বিসিবির এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন জাতীয় দলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে নেওয়া, তেমনি অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একজন অভিজ্ঞ বোলারের ধারাবাহিক উন্নয়ন ও ম্যাচ প্র্যাকটিসের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্সের চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদিন ফাহিম। বৃহস্পতিবার যমুনা টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মোস্তাফিজকে প্রায় পুরো আইপিএল খেলতে দেওয়া হলেও এপ্রিল মাসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ওয়ানডে সিরিজের জন্য তাকে অল্প সময়ের জন্য দেশে ফিরতে হবে। এই সময়কাল মোটামুটি আট দিনের মতো হতে পারে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি কোয়ালিফাই করার ক্ষেত্রে প্রতিটি সিরিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজটি।

নাজমুল আবেদিন ফাহিম বলেন, বিসিবি এখন আর ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে শুধু আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে দেখছে না। বরং এটিকে ক্রিকেটারদের উন্নয়নের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের বিপক্ষে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেলে ক্রিকেটারদের মানসিক দৃঢ়তা, কৌশলগত দক্ষতা এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতা বাড়ে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই মোস্তাফিজকে আইপিএলে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আইপিএলের ১৯তম আসর শুরু হওয়ার কথা আগামী বছরের ২৬ মার্চ এবং শেষ হবে ৩১ মে। প্রায় দুই মাসব্যাপী এই টুর্নামেন্ট বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক টি-টোয়েন্টি লিগ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটার এখানে অংশ নেন। এমন একটি মঞ্চে মোস্তাফিজের নিয়মিত অংশগ্রহণ তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পাশাপাশি বাংলাদেশ দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে মোস্তাফিজের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিজ্ঞ এই বাঁহাতি পেসার তার কাটার, স্লোয়ার এবং ডেথ ওভারের দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুপরিচিত। কেকেআরের বোলিং আক্রমণে বৈচিত্র্য আনতে মোস্তাফিজ বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের উইকেটে তার অফ-কাটার ও ক্রস-সিম ডেলিভারি কার্যকর হতে পারে, যা আগের মৌসুমগুলোতেও প্রমাণিত হয়েছে।
তবে জাতীয় দলের দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি দেওয়া হয়নি তাকে। বিসিবি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এপ্রিলের তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজে মোস্তাফিজের উপস্থিতি প্রয়োজন। যদিও সিরিজের চূড়ান্ত সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবু আইসিসির ভবিষ্যৎ সফরসূচি অনুযায়ী এই সময়েই সিরিজটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সফরে দুই দল তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিসিবির দৃষ্টিতে ওয়ানডে ফরম্যাট এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৭ বিশ্বকাপ সামনে রেখে র্যাঙ্কিংয়ের লড়াই এবং সরাসরি কোয়ালিফিকেশন নিশ্চিত করাই বোর্ডের প্রধান লক্ষ্য। সে কারণে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজগুলোতে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায় তারা। মোস্তাফিজের মতো অভিজ্ঞ বোলার এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নাজমুল আবেদিন ফাহিম আরও বলেন, ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সুযোগ পেলে বিসিবি সাধারণত খেলোয়াড়দের ছাড় দিতে আগ্রহী। উদাহরণ হিসেবে তিনি রিশাদ হোসেনের বিগ ব্যাশ লিগে খেলার কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি কোনো খেলোয়াড় ফ্রাঞ্চাইজি লিগে অংশ নিতে পারে, তাহলে তা জাতীয় দলের জন্যই লাভজনক। এতে করে খেলোয়াড়রা ম্যাচ ফিটনেস বজায় রাখতে পারেন এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, মোস্তাফিজের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত আরও যৌক্তিক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইনজুরি ও ফর্মের ওঠানামার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে থাকা তার আত্মবিশ্বাস ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সহায়ক হবে। আইপিএলের মতো টুর্নামেন্টে খেলে তিনি শুধু বোলিং নয়, ফিল্ডিং ও ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রেও নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবেন।

সমর্থকদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, জাতীয় দলের পাশাপাশি ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ভারসাম্য রেখে খেলানোই আধুনিক ক্রিকেট ব্যবস্থাপনার বাস্তব উদাহরণ। আবার কেউ কেউ জাতীয় দলের সিরিজের আগে অতিরিক্ত খেলার চাপ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করছেন। তবে বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খেলোয়াড়ের শারীরিক অবস্থা ও কাজের চাপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রায় পুরো আইপিএলে খেলার অনুমতি দেওয়া বিসিবির একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এতে করে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে, অন্যদিকে জাতীয় দলের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিও ব্যাহত হবে না। সামনে আইপিএল ও নিউজিল্যান্ড সিরিজ—দুই মঞ্চেই মোস্তাফিজের পারফরম্যান্স বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকবে।