ঝিনাইদহে ভোটের মাঠে বিএনপির দাপট চার আসনের তিনটিতেই এগিয়ে বিরোধী শিবির

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫
  • ২৯৭৮ বার

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দেশজুড়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জমে উঠেছে নানা জল্পনা-কল্পনা। একদিকে সরকারি দলের নির্বাচনি প্রস্তুতি, অন্যদিকে সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দমন-নিপীড়নের অভিযোগ পোহানো বিএনপি ও জামায়াত নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে মাঠে সক্রিয় হয়েছে। রাজনৈতিক উত্তাপের এই সময়ে ঝিনাইদহ জেলার চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত তিনটিতে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে বিএনপি, যেখানে জামায়াতও নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে মরিয়া।

একসময় বিএনপির অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঝিনাইদহের চারটি আসনেই এই বিরোধী দলটি পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যেই জেলায় একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে বিএনপি মনোনয়ন নিয়ে চলছে ভেতরের প্রতিযোগিতা, সভা-সমাবেশ আর পোস্টার-ফেস্টুনে সাজানো শহরজুড়ে ফুটে উঠছে নির্বাচনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত।

ঝিনাইদহ-১ (শৈলকূপা) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্তত তিনজন—মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ও অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান, সাবেক ছাত্রনেতা বাবু জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু এবং কেন্দ্রীয় কৃষক দলের নেতা ওসমান আলী বিশ্বাস। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তাদের লক্ষ্য একটাই—দলীয় টিকিট পেয়ে এই আসনটি পুনরুদ্ধার করা। এলাকাবাসীর ভাষায়, যার হাতেই ধানের শীষের প্রতীক উঠবে, তিনিই শৈলকূপার পরবর্তী সংসদ সদস্য হবেন—এ বিশ্বাস এতটাই গভীর যে এখানে কোনো বিকল্প চিন্তাই মানুষের মনে নেই। তবে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই গ্রুপিং, সমাবেশে বাধা এবং সহিংস ঘটনার খবরও মিলছে, যা দলীয় ভেতরের টানাপোড়েনকে স্পষ্ট করছে।

শৈলকূপার রাজনীতিতে জামায়াতও নিজেদের অবস্থান হারাতে চায় না। ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি বড় ভোট ব্যাংক এ এলাকায় এখনও সক্রিয়। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গন।

ঝিনাইদহ-২ (সদর-হরিণাকুণ্ডু) আসনে বিএনপির অবস্থান আরও সুসংগঠিত। একসময়ের চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য মরহুম মসিউর রহমানের ছায়া এখনও অনেকের মননে। তার ছেলে ডা. ইব্রাহিম বাবু, বর্তমান জেলা সভাপতি এমএ মজিদ ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি রাশেদ খানসহ একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের দৌড়ে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভোটারদের আস্থা ও দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মন জয়ের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক আলী আজম মো. আবুবকরও কোনো ফাঁক রাখতে চাইছেন না—তিনি হরিণাকুণ্ডুর প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মানুষের ভোট প্রার্থনায়।

ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আসনটিতেও জমজমাট লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট। সীমান্তঘেঁষা এ এলাকার নির্বাচনি লড়াইয়ে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, আমিরুজ্জামান খান শিমুল, মমিনুর রহমান মোমিন, কণ্ঠশিল্পী মনির খান ও মেহেদী হাসান রনি। তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ব্যারিস্টার কাজলের নামই বেশি আলোচিত। স্থানীয়দের বিশ্বাস, যদি কেন্দ্রীয় বিএনপি তাকে মনোনয়ন দেয়, তবে এ আসনে বিএনপির অবস্থান আরও শক্ত হবে। জামায়াতের অধ্যাপক মতিয়ার রহমানও এখানে শক্ত প্রার্থী হিসেবে দিন-রাত মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, কথা দিচ্ছেন দখলবাজদের শাসনের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার।

ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনে বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, হামিদুল ইসলাম হামিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী মুর্শিদা জামান। এখানে হামিদ ও ফিরোজকে ঘিরেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। স্থানীয়দের মতে, প্রার্থী চূড়ান্ত হলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সমর্থন আর সংগঠন যদি এক হয়, তাহলে এই আসনটিও বিএনপির হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে স্থানীয় কোন্দল আর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিএনপির ভাবমূর্তিতে কিছুটা আঁচ লাগিয়েছে। এদিকে কোনো গোষ্ঠী কোন্দল ছাড়াই জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আবু তালিব মাঠে আছেন নিরবে-নিভৃতে, মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন।

জেলার সার্বিক নির্বাচনি চিত্রে স্পষ্ট, দীর্ঘ দমনের পর বিএনপি ও জামায়াত কর্মীরা এখন তুলনামূলক মুক্ত পরিবেশে ভোটের লড়াইয়ে নিজেদের প্রস্তুত করছে। একসময়ের চিরাচরিত ‘দিনের ভোট রাতে’ হবার শঙ্কা নেই বলেই দাবি করছেন অনেকে। জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ১৬ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি—এবারের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদ চিরতরে বিদায় নেবে। জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক আব্দুল আওয়ালও আস্থা রেখেছেন সাধারণ মানুষের ন্যায়বোধের ওপর—তিনি বলেছেন, দুর্নীতি আর দখলদারিত্বের রাজনীতিকে মানুষ আর ফিরিয়ে আনতে চায় না।

ঝিনাইদহের রাজনৈতিক মাঠের এমন চিত্র এবার প্রমাণ করবে, নির্বাচনি বাতাসে নতুন আশা বুনতে পেরেছে কিনা বিএনপি ও জামায়াত—না কি দলীয় ভেতরের কোন্দল আর অজানা সমীকরণে হাতছাড়া হবে একসময়ের শক্তিশালী এই দুর্গ। সময়ই শেষ কথা বলবে। তবে ভোটের মাঠে সরগরম এই জেলার হাওয়া জানান দিচ্ছে—শেষ লড়াই পর্যন্ত নাটকীয়তা বজায় থাকবে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত