প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রতিবছর শীত এলেই বাংলাদেশের আকাশ, হাওর-বাঁওড় আর জলাভূমিতে শুরু হয় এক নীরব উৎসব। হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে হিমালয়ের পাদদেশ, সাইবেরিয়া, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, তিব্বতের উপত্যকা, ফিলিপিন্স, আসাম ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিযায়ী বা অতিথি পাখিরা এসে হাজির হয় আমাদের দেশে। প্রকৃতির এই অনন্য নিয়মে তারা শীতের তীব্রতা এড়িয়ে সাময়িক আশ্রয় নেয় উষ্ণ ও খাদ্যে ভরপুর ভূখণ্ডে। কয়েক মাস পর আবারও তারা ফিরে যায় নিজ নিজ আবাসে। এই আগমন কেবল সৌন্দর্যের নয়, এটি পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক শৃঙ্খলার এক অপরিহার্য অংশ।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা এসব পাখির অনেকের শরীর তখন ক্লান্ত, পালক ঝরে পড়া কিংবা দুর্বল অবস্থায় থাকে। আমাদের জলাভূমি, হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা ও চরাঞ্চলে কিছুদিন থাকার পর পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয় ও অনুকূল পরিবেশ পেয়ে তারা আবার স্বাভাবিক গড়নে ফিরে আসে। প্রকৃতি যেন তাদের জন্য খুলে দেয় বিশ্রামের দুয়ার। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, সেই আশ্রয়স্থলগুলো এখন আর আগের মতো নিরাপদ নেই। অতিথি পাখিদের জন্য আমাদের দেশ ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ এক গন্তব্য।
শীত মৌসুম এলেই দেশের একশ্রেণির অতিলোভী শিকারি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে এই সময়টির জন্য। হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল আর চরাঞ্চলে ফাঁদ পেতে, গুলি চালিয়ে কিংবা নিষ্ঠুর উপায়ে পাখি শিকার করা হয়। অনেক সময় মজা, অনেক সময় অবৈধ বাণিজ্য—যে কারণেই হোক, এর ফল ভয়াবহ। অতিথি পাখির সংখ্যা প্রতিবছর কমছে, তাদের নিরাপদ বিচরণ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পাখিবিশেষজ্ঞদের মতে, এক দশক আগেও বাংলাদেশে ২০০ থেকে ২১৫ প্রজাতির অতিথি পাখির আগমন নিয়মিত ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ অবাধ শিকার ও জলাভূমির সংকট।
শীতকালে এ দেশে যেসব পাখির দেখা মেলে, তার মধ্যে সোনাজঙ্গ, খুরুলে, হরিয়াল, দুর্গা, রাজশকুন, হলদে খঞ্চনা, তিলে ময়না, রামঘুঘু, কুনচুষী, বাতারণ, শাবাজ, জলপিপি, লালবন মোরগসহ নানা প্রজাতি উল্লেখযোগ্য। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর, সুন্দরবনের নদ-নদী, কুয়াকাটার চর ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে অতিথি পাখির আগমন পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করে। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা এসব স্থানে ছুটে আসেন প্রকৃতির এই অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু পাখিরা যদি নিরাপদ না থাকে, তবে এই সৌন্দর্য ও সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
সরকারি তথ্যমতে, অতিথি পাখির জন্য হাওর-বাঁওড় ও মুক্ত জলাশয়সহ অন্তত ১২টি অভয়ারণ্য থাকার কথা। বাস্তবতা হলো, কাগজে-কলমে এসব অভয়ারণ্য থাকলেও প্রকৃত অর্থে নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ আজও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। অনেক অভয়ারণ্যে নেই পর্যাপ্ত নজরদারি, নেই কার্যকর ব্যবস্থাপনা। এর বাইরে গ্রামাঞ্চলের খাল-বিল ও জলাশয়গুলোও ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন ও অবৈধ দখলের কারণে খাল-বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা অতিথি পাখিরা তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও আশ্রয় পাচ্ছে না।
আইনের দিক থেকে বাংলাদেশে অতিথি পাখি রক্ষার বিধান রয়েছে। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী পাখি শিকার ও হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনে বলা হয়েছে, পোষা পাখি লালনপালন, খামার স্থাপন কিংবা কেনাবেচার জন্য লাইসেন্স নিতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। ফলে শিকারিরা প্রায় নির্বিঘ্নেই তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
শুধু আইন প্রণয়ন করলেই অতিথি পাখি রক্ষা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন আইনের কঠোর ও নিয়মিত প্রয়োগ। যেসব এলাকায় পরিযায়ী পাখির বিচরণ বেশি, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন। প্রতিবছর যারা এই মৌসুমে পাখি নিধনে জড়ায়, তাদের স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা অন্য শিকারিদের জন্যও সতর্কবার্তা হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ মানুষের সচেতনতা। অতিথি পাখিরা আমাদের সম্পদ, আমাদের প্রকৃতির অংশ—এই বোধ যদি সমাজে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে কোনো আইনই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালানো এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার চালানো জরুরি। পাখি দেখা ও প্রকৃতি উপভোগের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে শিকার প্রবণতা কমবে।
অতিথি পাখির নিরাপত্তা মানে কেবল কয়েকটি প্রজাতিকে রক্ষা করা নয়; এটি পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন। পাখিরা কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, বীজ বিস্তার এবং জলাভূমির স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা হারিয়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে কৃষি, মৎস্য ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও। তাই অতিথি পাখির জন্য নিরাপদ অভয়ারণ্য নিশ্চিত করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
শীতের আকাশে ডানা মেলে উড়া অতিথি পাখিরা আমাদের কাছে কেবল দর্শনার্থী নয়, তারা প্রকৃতির বার্তাবাহক। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। লোভ, নিষ্ঠুরতা আর উদাসীনতা যদি জয়ী হয়, তবে একদিন এই আকাশ নীরব হয়ে যাবে। সেই নীরবতা আমাদের জন্য কখনোই সুখকর হবে না। তাই আজই সময়—অতিথি পাখি নিরাপদে থাকুক, প্রকৃতি বাঁচুক, মানুষ বাঁচুক।