হাদির হত্যার প্রতিবাদে শাহবাগে উত্তাল ছাত্র-জনতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৩ বার
শাহবাগে ছাত্র জনতা বিক্ষোভ

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগ মোড় শুক্রবারও রূপ নিয়েছে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে। ভোরে উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছাত্র-জনতার ঢল নামে। সকাল সাড়ে ৯টার পর থেকেই শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ। কেউ সংগঠিত মিছিল নিয়ে, কেউ আবার নিজ উদ্যোগে এসে যোগ দেন এই বিক্ষোভে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শাহবাগ এলাকা।

প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠে ছিল হাদির হত্যার বিচার, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা অভিযোগ করেন, প্রকাশ্য দিবালোকে একজন রাজনৈতিক কর্মীকে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম ব্যর্থতার প্রমাণ। তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এমন সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য মারাত্মক হুমকি।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী ঢাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ শুরু হয়। শাহবাগে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন জুলাই মঞ্চের কর্মী-সমর্থকরা। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে উপাচার্য চত্বর ও রাজু ভাস্কর্যে শিক্ষার্থীরা জড়ো হন। পরে সেখান থেকে একটি বড় মিছিল বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহবাগে এসে শেষ হয়। এতে অংশ নেন বুয়েটসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও।

শাহবাগের চলমান বিক্ষোভে ধীরে ধীরে যোগ দেন জাতীয় ছাত্রশক্তি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাও। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সাবেক দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম সরাসরি বিক্ষোভে উপস্থিত হন। তাদের সঙ্গে আরও অনেক এনসিপি নেতা-কর্মীও শাহবাগে অবস্থান নেন। বক্তৃতায় তারা বলেন, হাদির হত্যাকাণ্ড একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক সহিংসতার অংশ। তারা অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন এবং হত্যার পেছনে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, শরিফ ওসমান হাদি কেবল একটি সংগঠনের মুখপাত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তার হত্যার মধ্য দিয়ে ভিন্নমত দমন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই বার্তা ছাত্রসমাজ গ্রহণ করবে না বলেও তারা স্পষ্ট করেন। অনেক শিক্ষার্থী প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাদের ভাষায়, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও নিরাপদ রাজনীতি নিশ্চিত না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে।

এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষুব্ধ একটি দল হঠাৎ ওই ভবনগুলোর সামনে এসে হামলা চালায়। এ ঘটনায় সাংবাদিক মহলসহ সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এটিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

হাদির মৃত্যুকে ঘিরে সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায়ও প্রতিবাদ কর্মসূচির খবর পাওয়া যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহরে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করছেন। অনেকে কালো ব্যাজ ধারণ করে শোক প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে তারা হত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন।

উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের উদ্দেশ্যে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গেলে চলন্ত একটি মোটরসাইকেল থেকে শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। গুলিটি তার মাথায় লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার রাতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

হাদির মৃত্যু শুধু তার পরিবার বা সংগঠনের জন্য নয়, বরং চলমান রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে রাজনৈতিক সহিংসতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভিন্নমতের প্রতি রাষ্ট্রীয় সহনশীলতা নিয়ে। একই সঙ্গে এটি তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়িয়েছে।

শাহবাগে অবস্থান নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা কোনো সহিংসতা চাই না, কিন্তু ন্যায়ের দাবিতে রাজপথে থাকব। হাদির হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।” আরেকজন বলেন, “আজ হাদি, কাল যে কেউ হতে পারে। তাই এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে।”

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে তারা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করে তদন্তের অগ্রগতি জানানো হয়নি, যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে আরও অসন্তোষ তৈরি করছে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহবাগে জনসমাগম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমেই তারা তাদের দাবি তুলে ধরবেন। তবে দাবি আদায় না হলে কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিতও দিয়েছেন তারা।

এই মুহূর্তে শাহবাগ কেবল একটি মোড় নয়; এটি হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, শোক এবং ন্যায়ের দাবির প্রতীক। শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো সামনে এনে দিয়েছে, তার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই উত্তাল পরিস্থিতি সহজে প্রশমিত হবে না বলেই মনে করছেন অনেকেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত