প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই গণ-আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ বান্দরবান জেলা শহরের সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং-এর বাসভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। আকস্মিক এই সহিংসতায় জেলা শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো এলাকা কার্যত থমথমে হয়ে ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে হাদির মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বান্দরবান শহরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একদল উত্তেজিত ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। স্লোগানে স্লোগানে তারা হাদির হত্যার বিচার দাবি করে এবং এর পেছনে যারা জড়িত বলে সন্দেহ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। একপর্যায়ে মিছিলটি জেলা শহরের একটি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং-এর পাঁচতলা বিশিষ্ট বাসভবনের সামনে গিয়ে জড়ো হয়।
স্থানীয়রা জানান, হঠাৎ করেই বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ বাসভবনের গেটে ভাঙচুর শুরু করে। এরপর ভবনের নিচতলার একটি অংশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিসংযোগের পর মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো ভবনের একটি বড় অংশ দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। বাসার নিচে পার্কিং করা দুটি প্রাইভেটকার ও একটি মোটরসাইকেলও আগুনে পুড়ে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বান্দরবান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একাধিক ইউনিট। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। তাদের তৎপরতায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হলেও ভবনের অধিকাংশ অংশ পুড়ে যায় এবং ব্যাপক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। বান্দরবান জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও মাঠে নামানো হয়। রাজার মাঠ এলাকা, প্রধান সড়ক ও সংবেদনশীল স্থানে সেনা-পুলিশ যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে। রাতে ও ভোরে টহল আরও বাড়ানো হয় যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
বান্দরবান ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ফারুক আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, সাবেক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং-এর বাসায় অগ্নিসংযোগের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। আগুনে দুটি প্রাইভেট গাড়ি, একটি মোটরসাইকেল এবং ভবনের বড় একটি অংশ পুড়ে গেছে। তবে কোনো হতাহতের খবর নেই, যা আমাদের জন্য স্বস্তির।
এদিকে বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার আবদুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার পরপরই আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে যাতে হামলাকারীদের শনাক্ত করা যায়। তারা বলেন, কোনোভাবেই সহিংসতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বরদাশত করা হবে না।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে বান্দরবান শহরের সাধারণ মানুষ চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। অনেক দোকানপাট আগেভাগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং রাতের বেলা লোকজন প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ থাকলেও এভাবে বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
উল্লেখ্য, শরিফ ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগ শেষে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন। চলন্ত একটি মোটরসাইকেল থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়, যা তার মাথায় লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার এই মৃত্যু সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, হাদির মৃত্যুর পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা রাজনৈতিক উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ। তারা বলছেন, এই ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। একই সঙ্গে তারা সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বান্দরবানে সাবেক মন্ত্রীর বাসায় হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, প্রতিবাদের নামে সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও পেছনের শক্তিগুলো দ্রুত প্রকাশ করা না হলে জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়বে।
বর্তমানে বান্দরবান শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক কাটেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে শান্ত থাকার এবং গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বান্দরবানের এই সহিংসতা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগোয় এবং পরিস্থিতি কতটা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।