ডিভি লটারি স্থগিতে ট্রাম্পের বড় সিদ্ধান্ত, তোলপাড় যুক্তরাষ্ট্রে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৭ বার
ডিভি লটারি স্থগিতে ট্রাম্পের বড় সিদ্ধান্ত, তোলপাড় যুক্তরাষ্ট্রে

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ডাইভারসিটি ভিসা বা গ্রিন কার্ড লটারি কর্মসূচি নিয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ব্রাউন ইউনিভার্সিটি ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)-তে সংঘটিত ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি ডিভি লটারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন—এই তথ্য সামনে আসার পরই কর্মসূচিটি সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দেন তিনি। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসকে (ইউএসসিআইএস) ডাইভারসিটি ভিসা লটারি কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। নোয়েম বলেন, এই কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল একটি গুরুতর নিরাপত্তা ব্যর্থতার উদাহরণ। তার ভাষায়, ‘এই জঘন্য ব্যক্তিকে কখনোই আমাদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া উচিত হয়নি।’

যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সিদ্ধান্ত, তা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পর্তুগালের নাগরিক ৪৮ বছর বয়সি ক্লদিও নেভেস ভ্যালেন্তে ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন। ওই ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হন এবং নয়জন গুরুতর আহত হন। শুধু তাই নয়, এমআইটির এক অধ্যাপককে হত্যার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়, যা আত্মহত্যাজনিত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ম্যাসাচুসেটসের মার্কিন অ্যাটর্নি লিয়া বি. ফোলি জানান, ক্লদিও নেভেস ভ্যালেন্তে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা লিগ্যাল পার্মানেন্ট রেসিডেন্টের মর্যাদা অর্জন করেন। তার এই অভিবাসন প্রক্রিয়ার সূত্র ছিল ডাইভারসিটি ভিসা লটারি কর্মসূচি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই ট্রাম্প প্রশাসন কর্মসূচিটি নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয় এবং দ্রুত স্থগিতাদেশ জারি করে।

ডাইভারসিটি ভিসা লটারি কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কংগ্রেসের মাধ্যমে চালু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫০ হাজার মানুষকে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। মূলত যেসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার তুলনামূলকভাবে কম, তাদের জন্যই এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। বাংলাদেশসহ বহু উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের কাছে এটি দীর্ঘদিন ধরে ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ পূরণের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

তবে এই কর্মসূচি নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্পের আপত্তি নতুন নয়। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ থেকেই তিনি ডিভি লটারির সমালোচক। তার দাবি, এই পদ্ধতিতে অভিবাসী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ব্রাউন ও এমআইটির সাম্প্রতিক ঘটনার পর ট্রাম্পের সেই বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক শক্তি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিভি লটারি স্থগিতের সিদ্ধান্ত সহজে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। যেহেতু এটি কংগ্রেস অনুমোদিত একটি কর্মসূচি, তাই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে স্থগিত রাখা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যেই অভিবাসন আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

২০২৫ সালের ডিভি লটারির পরিসংখ্যানও এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি বছরের লটারির জন্য প্রায় দুই কোটি মানুষ আবেদন করেছিলেন। বিজয়ীদের জীবনসঙ্গীদের অন্তর্ভুক্ত করে মোট এক লাখ ৩১ হাজারের বেশি আবেদনকারী নির্বাচিত হন। যদিও লটারি জিতলেই সরাসরি গ্রিন কার্ড পাওয়া যায় না। বিজয়ীরা কেবল আবেদন করার আমন্ত্রণ পান এবং এরপর তাদের কনস্যুলার সাক্ষাৎকার, নিরাপত্তা যাচাই এবং অন্যান্য কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পর্তুগালের নাগরিকরা এ বছর মাত্র ৩৮টি ভিসা লাভ করেন, যার মধ্যে একজন ছিলেন ক্লদিও নেভেস ভ্যালেন্তে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, এত স্তরের যাচাই-বাছাইয়ের পরও কীভাবে এমন একজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বর্তমান ব্যবস্থায় ফাঁকফোকর রয়েছে, যা দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।

ডিভি লটারি স্থগিতের ঘোষণার পর অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে যারা এই কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, এটি অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিরই নতুন প্রকাশ।

সব মিলিয়ে, ডিভি লটারি কর্মসূচি স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি, নিরাপত্তা ভাবনা এবং রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিফলন। এই সিদ্ধান্ত কতদিন বহাল থাকবে এবং আইনি ও রাজনৈতিক চাপে কীভাবে এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত