প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বগুড়ায় স্ত্রীর শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনা স্থানীয় জনজীবনকে আতঙ্কে ফেলে দিয়েছে। বগুড়া সদর উপজেলার নুরইল মধ্যপাড়া গ্রামের মুকুল মিয়ার বিরুদ্ধে তার স্ত্রী মারুফা আক্তারকে হত্যা করে মরদেহ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে রাখার অভিযোগ ওঠেছে। ঘটনার পর তিনি থানায় স্ত্রী নিখোঁজের জিডি করেন, যাতে তার অপরাধ আড়াল হয়। কিন্তু গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে সন্দেহের ভিত্তিতে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে হত্যার কথা স্বীকার করলে বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে মারুফার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে বগুড়া সদর উপজেলার নুরইল মধ্যপাড়া গ্রামের মুকুল মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে মারুফা আক্তারের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মুকুল মিয়া স্বীকার করেছেন, স্ত্রী টিকটক ভিডিও করাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহের কারণে তিনি শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন। হত্যার পর লাশ লুকাতে বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে ফেলে রাখা হয়।
বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তফা মঞ্জুর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, নিহত মারুফা আক্তার পীরগাছা গ্রামের বাসিন্দা। অভিযুক্ত মুকুল মিয়া নুরইল গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় ঢালাই মিস্ত্রি। তাদের বিয়ে হয়েছিল প্রায় ৯ বছর আগে। পুলিশ জানায়, দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘদিন ধরে টিকটক ভিডিও তৈরি ও প্রকাশকে কেন্দ্র করে টানাপোড়েন চলছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়, তবে তিন মাস আগে পুনরায় বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। দম্পতির ছয় বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, গত ১১ ডিসেম্বর মারুফা আক্তার তার চাচাতো বোনের বিয়েতে নাচের একটি ভিডিও টিকটকে প্রকাশ করেন। এর পর ১৩ ডিসেম্বর রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র ঝগড়া হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মুকুল মিয়া একপর্যায়ে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। হত্যার পর লাশ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দিয়ে তিনি ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করেন। দুই দিন পর ১৫ ডিসেম্বর থানায় গিয়ে স্ত্রী নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তফা মঞ্জুর জানান, মুকুল মিয়াকে আটক করা হয়েছে। নিহত মারুফা আক্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এই ঘটনায় পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ঘটনাটি সামাজিক ও পারিবারিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ ডায়েরিতে ঘটনার আড়াল করার চেষ্টা, তারপর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে হত্যার সত্যতা প্রকাশ—এ সবই দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রমাণ করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গুরুত্ব এবং সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও দাম্পত্য সহিংসতার বিষয়ে সচেতনতার প্রয়োজন। ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত দাম্পত্য কলহ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় সমাজ ও প্রশাসন সতর্ক হয়ে উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংসতা প্রতিরোধ করা যায়। বগুড়া সদর ও নুরইল এলাকার সাধারণ মানুষ গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মারুফা আক্তারের ছোট কন্যাসন্তানও এ ঘটনার কারণে মানসিক ও আবেগিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা কড়া ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে।
ঘটনাটি কেবল একটি দাম্পত্য কলহের ফল নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা, নারীর সুরক্ষা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা সম্পর্কেও নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। মুকুল মিয়ার স্বীকারোক্তি এবং লাশ উদ্ধারের প্রমাণ ভবিষ্যতের বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে। ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পুলিশি ব্যবস্থা বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ও দাম্পত্য সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।