নির্বাচন বানচালের আশঙ্কা, কুমিল্লা সীমান্তে অস্ত্রের ছায়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৭ বার
নির্বাচন বানচালে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের আশঙ্কা

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে, ঠিক তখনই কুমিল্লা সীমান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং নির্বাচনকালীন স্থিতিশীলতা—সবকিছু মিলিয়ে কুমিল্লা এখন যেন এক নীরব আতঙ্কের জনপদ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গত বছরের ৫ আগস্ট কুমিল্লার বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ১৭টি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এর মধ্যেই গোয়েন্দা সূত্র ও সীমান্তবর্তী অভিযানের তথ্য বলছে, নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে এই জেলার ভারত সীমান্ত দিয়ে নতুন করে অস্ত্র ঢুকছে।

লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে দীর্ঘ সময় পার হলেও অগ্রগতি না থাকায় জনমনে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন—পুলিশের অস্ত্রই যদি নিরাপদ না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়লেও শুরুতে প্রশাসনের তৎপরতা ছিল সীমিত। গত অক্টোবরে কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে বিদায়ী জেলা প্রশাসক ও বিদায়ী পুলিশ সুপারের কাছে লুট হওয়া অস্ত্রের হিসাব জানতে চাওয়া হলে তারা বিভিন্ন অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে সম্প্রতি কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) রাশেদুল হক চৌধুরী স্বীকার করেছেন, ১৭টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য আরও উদ্বেগজনক। সূত্রগুলো বলছে, খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলো কার হাতে রয়েছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কী কিংবা আদৌ উদ্ধার করা যাবে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই পুলিশের কাছে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন অস্ত্র দেশে ঢোকানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে, যেখানে আগে মূলত মাদক পাচারের ঘটনা শোনা যেত, এখন সেখানে আগ্নেয়াস্ত্র পাচারের তথ্য সামনে আসছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় চালানো অভিযানে নেশাজাতীয় দ্রব্যের পাশাপাশি কয়েকটি প্রাণঘাতী অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গত মাসে গোমতি নদী সংলগ্ন গোলাবাড়ী সীমান্ত এলাকায় রাতের অন্ধকারে গাঁজার সঙ্গে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। বিজিবির কর্মকর্তারা বলছেন, কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা এটাই প্রথম নয়, তবে নির্বাচনের আগে এ ধরনের চালান ধরা পড়া পরিস্থিতির গভীরতা নির্দেশ করে। তাদের ধারণা, নির্বাচন সামনে রেখেই এই অস্ত্রের চালানগুলো দেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই তথ্য ঘিরে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগেই অরাজক পরিস্থিতি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কুমিল্লার বিভিন্ন আসনের এমপি প্রার্থীদের টার্গেট করা হচ্ছে। কুমিল্লা-৪ আসনে এনসিপির মনোনয়ন পাওয়া দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, ইতোমধ্যে ভারত থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি শুধু একজন প্রার্থীর নিরাপত্তা নয়, পুরো নির্বাচনী পরিবেশের জন্যই ভয়াবহ সংকেত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে তফসিল ঘোষণার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার প্রায় ১০৪ কিলোমিটার অংশে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক মাসে দফায় দফায় ঝটিকা মিছিল করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে তারা। স্থানীয়রা বলছেন, এসব মিছিলের পেছনে রয়েছে পলাতক কিছু আওয়ামী ক্যাডারের আর্থিক সহায়তা, যারা সীমান্তের ওপার থেকে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে।

কুমিল্লার সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা অবস্থান এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির বহু নেতা কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রতিবেশী দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে ত্রিপুরায়, পলাতক আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। সেখান থেকেই নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অস্ত্র বাংলাদেশে পাঠানোর পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও প্রকাশ্যে এই উদ্বেগের কথা জানাচ্ছেন। এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার যুগ্ম সমন্বয়ক রাশেদুল হাসান বলেন, অস্ত্রের মুখে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন করে আসার পর প্রায় দেড় বছর হতে চললেও এখনো বহু অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মীরা সবাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, আর এর দায় প্রশাসনের ব্যর্থতার ওপরই বর্তায়।

কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়া অত্যন্ত আতঙ্কের বিষয়। নির্বাচনের আগেই এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারলে জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। সীমান্ত দিয়ে নতুন অস্ত্র আসার খবর এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

একই সুর শোনা যায় কুমিল্লা মহানগর এবি পার্টির সভাপতি গোলাম সামদানীর কণ্ঠে। তিনি বলেন, ভারতে বসে নির্বাচন বানচাল করার জন্য ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাঠানো হচ্ছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীদের এখনো গ্রেপ্তার করতে না পারায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা।

অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আশ্বাস দিচ্ছে যে তারা বসে নেই। কুমিল্লা ব্যাটালিয়ন (১০ বিজিবি) অধিনায়ক কর্নেল মীর আলী এজাজ জানিয়েছেন, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং যে কোনো ধরনের অস্ত্র পাচার রোধে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল হক চৌধুরীও বলেছেন, অনেক অস্ত্র ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে এবং বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ কাজে সেনাবাহিনী ও র‍্যাবও সহযোগিতা করছে।

তবুও বাস্তবতা হলো, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই কুমিল্লা সীমান্তকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। লুট হওয়া অস্ত্রের অমীমাংসিত রহস্য, নতুন করে অস্ত্র পাচারের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে এই জেলা এখন জাতীয় নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে। শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে সীমান্ত নিরাপত্তা, অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাস দমনে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত