প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় জমির আইল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে ভয়াবহ সংঘর্ষে হাবিব শেখ (৪২) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় আরও চারজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শান্ত গ্রামীণ জনপদে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং শোকের ছায়া নেমে এসেছে নিহতের পরিবার ও স্বজনদের মাঝে।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের ব্যাঙডুবি বিল এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কৃষিকাজের সময় জমির আইল বা সীমানা নিয়ে একই পরিবারের চাচাতো ভাইদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই তর্ক-বিতর্ক রূপ নেয় হাতাহাতি ও সংঘর্ষে, যা শেষ পর্যন্ত একজনের প্রাণ কেড়ে নেয়।
নিহত হাবিব শেখ নবাবপুর ইউনিয়নের বনগ্রাম এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত শেখের ছেলে। তিনি পেশায় একজন কৃষিশ্রমিক ছিলেন এবং নিয়মিতভাবে অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঘটনার দিন তিনি শরিফুল শেখের পাওয়ার টিলার চালাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে। আহত ব্যক্তিরা সবাই একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন মনজু শেখের ছেলে শরিফুল শেখ (৩৫) ও টোকন শেখ (৩২), আবেদ আলী শেখের ছেলে জামাল উদ্দিন শেখ (৬০) এবং রাকিব শেখ (২৭)। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শরিফুল শেখ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, জমিতে চাষের প্রস্তুতির সময় জমির আইল নিয়ে তার সঙ্গে চাচাতো ভাই জামাল উদ্দিন শেখের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে জামাল উদ্দিন ও তার ছেলে রাকিব ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে এবং তার ভাই টোকন শেখকে মারধর শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে হাবিব শেখ মারধর থামাতে এগিয়ে আসেন। এ সময় ধাক্কাধাক্কি ও মারপিটের মধ্যে তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই আকস্মিক মৃত্যুর খবরে ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহত হাবিব শেখের পরিবার দাবি করেছে, সংঘর্ষের সময় শারীরিক আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশ ও চিকিৎসকরা বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন।
বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফারুক হোসেন জানান, হাবিব শেখকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, মৃত্যুর পেছনে শারীরিক আঘাত, অতিরিক্ত ধাক্কা বা হার্ট অ্যাটাক—কোনটি দায়ী, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।
এ বিষয়ে বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রব তালুকদার বলেন, জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন এবং একজন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও জানান, সংঘর্ষের সময় ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনার মধ্যে নিহত ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কি না, নাকি সরাসরি মারধরের ফলে তার মৃত্যু হয়েছে—তা এখনও নিশ্চিত নয়। পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গ্রামীণ এলাকায় জমির সীমানা বা আইল নিয়ে বিরোধ নতুন কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই ছোটখাটো বিরোধ বড় সংঘর্ষে রূপ নেয়। তবে এই ঘটনায় একজন নিরীহ কৃষকের প্রাণ হারানোয় সবাই গভীরভাবে মর্মাহত। তারা প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নিহত হাবিব শেখের পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। তিনি ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছে। নিহতের স্ত্রী ও সন্তানদের কান্নায় এলাকার মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। গ্রামবাসীরা জানান, হাবিব ছিলেন শান্ত প্রকৃতির মানুষ, কখনো কারও সঙ্গে ঝগড়ায় জড়াতেন না। শুধু মারপিট থামাতে গিয়েই তার জীবন চলে গেল—এটা কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, গ্রামে গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো সালিশ বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না হলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তে পারে। তারা সবাইকে সংযম ও আইনের আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্তমানে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো, জমির আইল নিয়ে সামান্য বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে একটি পরিবার ও একটি জনপদকে।