প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিকদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যত্রতত্র বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর ধোঁয়া বন্ধে এবার সাধারণ মানুষের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে—বর্জ্য পোড়ানোর ঘটনা চোখে পড়লে তার ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠালে সেরা ১০টি ছবির জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা দীপংকর বর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটার নির্গমন, শিল্পকারখানার বর্জ্য ও ধোঁয়ার পাশাপাশি খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো বিশেষভাবে দায়ী। এসব কারণে দেশের বিভিন্ন শহর ও শিল্পাঞ্চলের বায়ুমান দিন দিন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্জ্য পোড়ানোর ফলে নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস ও সূক্ষ্ম কণিকা মানুষের শ্বাসতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন এই দূষিত বাতাসে বসবাস করলে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদ্রোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। শিশু, বয়স্ক এবং গর্ভবতী নারীরা এর সবচেয়ে বেশি শিকার হন। এ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও আরও তীব্র হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার বায়ুদূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে বর্জ্য পোড়ানোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বর্জ্য পোড়ানোর স্থান শুধু প্রশাসনের পক্ষে এককভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। তাই নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এই অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো নাগরিক যদি কোথাও বর্জ্য পোড়ানোর ঘটনা দেখতে পান, তাহলে সেই ঘটনার ছবি তুলে climatechange2@moef.gov.bd ই-মেইল ঠিকানায় পাঠাতে পারবেন। তবে শুধু ছবি পাঠালেই হবে না। ছবির সঙ্গে অবশ্যই প্রেরক বা ফটোগ্রাফারের নাম, যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর, ঘটনার সুনির্দিষ্ট অবস্থান, এলাকার ঠিকানা এবং ঘটনার সময় উল্লেখ করতে হবে। এসব তথ্যের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্রতি মাসে প্রাপ্ত সব ছবি যাচাই-বাছাই করে সেরা ১০টি ছবি নির্বাচন করা হবে। নির্বাচিত ব্যক্তিদের জন্য থাকবে বিশেষ পুরস্কার। যদিও পুরস্কারের ধরন বা পরিমাণ বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি, তবে নাগরিকদের পরিবেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
পরিবেশবিদরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ একদিকে যেমন জনগণকে সচেতন করবে, অন্যদিকে প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করবে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বায়ুদূষণ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুম এলেই রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলের বায়ুমান বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে আসে। এর পেছনে বর্জ্য পোড়ানো একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর কারণ।
ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক সময় এসব বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয় এবং পরে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে জায়গা পরিষ্কার হলেও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া। এই ধোঁয়ার প্রভাব শুধু আশপাশের এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বাতাসের সঙ্গে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্য পোড়ানোর ফলে যে ডাই-অক্সিন, ফিউরান ও সূক্ষ্ম কণিকা বাতাসে মিশে যায়, সেগুলো মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।
সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলো। তাদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া বায়ুদূষণের মতো জটিল সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ যদি নিজের চোখে দেখা অপরাধের তথ্য সরাসরি কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন, তাহলে অপরাধীরা যেমন সতর্ক হবে, তেমনি প্রশাসনিক ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় নাগরিকদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। অনেক সময় মানুষ বর্জ্য পোড়ানোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানলেও বিষয়টি এড়িয়ে যান বা গুরুত্ব দেন না। কিন্তু ছবি পাঠিয়ে পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ থাকায় বিষয়টি নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়বে। ফলে বর্জ্য পোড়ানোর ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, জরিমানা ও অন্যান্য আইনগত পদক্ষেপও নেওয়া হবে। এতে করে বর্জ্য পোড়ানোর প্রবণতা নিরুৎসাহিত হবে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বায়ুদূষণরোধে সরকারের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী। প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার একটি সম্মিলিত প্রয়াস গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য। নাগরিক সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে যদি বর্জ্য পোড়ানোর মতো ক্ষতিকর অভ্যাস বন্ধ করা যায়, তাহলে দেশের বায়ুমান উন্নত হবে, কমবে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।