কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভে উত্তেজনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ ঘিরে আবারও ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সংবেদনশীল একটি অধ্যায় সামনে এসেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি সংগঠনের ডাকে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ একপর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়ে।

এই বিক্ষোভের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের ময়মনসিংহে সংঘটিত একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সেখানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা এবং পরে তার মরদেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করতে এই সমাবেশ ডাকা হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা অমিতাভ ভট্টশালী ঘটনাস্থল থেকে জানান, মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে বিক্ষোভকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে জড়ো হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরেন এবং কূটনৈতিক মিশনের সামনে প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শন করেন।

পুলিশ প্রশাসন আগে থেকেই সম্ভাব্য উত্তেজনার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ডেপুটি হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কূটনৈতিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডেপুটি হাইকমিশনের প্রায় দুশো মিটার দূর পর্যন্ত তিন স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়, যাতে কোনোভাবেই বিক্ষোভকারীরা কূটনৈতিক ভবনের কাছাকাছি যেতে না পারেন।

তবে সমাবেশ শুরুর কিছু সময় পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রথম ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে বিক্ষোভকারীরা। এতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

বিবিসির সংবাদদাতা জানান, বিক্ষোভকারীরা দ্বিতীয় ব্যারিকেডের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন পুলিশ বাধ্য হয়ে লাঠিচার্জ করে। পুলিশের লাঠিচার্জে বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং তাদের ডেপুটি হাইকমিশন কার্যালয় থেকে অন্তত একশো মিটার দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যদিও পুলিশ পক্ষ থেকে হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি।

পুলিশ প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। কলকাতা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে, তবে কোনো অবস্থাতেই কূটনৈতিক স্থাপনার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।

এই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ পুলিশের ভূমিকার সমর্থন জানালেও, আবার কেউ কেউ বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জকে অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশ দাবি করেছে, প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবেদনশীল কূটনৈতিক বিষয়গুলোতে সংযম দেখানো জরুরি।

বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেওয়া না হলেও কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, তারা পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে। কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় ভারতীয় প্রশাসনের ভূমিকার প্রশংসাও করা হয়েছে বলে জানা যায়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের বিক্ষোভ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দুই দেশের জনগণের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বাড়াতে পারে। ভারত ও বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে এবং দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে যেকোনো সংবেদনশীল ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার নজির রয়েছে। তাই এই ঘটনার প্রভাব যেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষকেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত