ইন্টারনেট বন্ধে নিষেধাজ্ঞা রেখে টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ অনুমোদন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৭ বার
ইন্টারনেট বন্ধে নিষেধাজ্ঞা রেখে টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ অনুমোদন

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কখনোই ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ করা যাবে না—এমন সুস্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক বিধান যুক্ত করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশের সংশোধিত খসড়া অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। ডিজিটাল অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যোগাযোগের অপরিহার্যতা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক ও সময়োপযোগী বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী এবং নীতিনির্ধারকরা। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, উপদেষ্টা পরিষদের ৫২তম বৈঠকে এই সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, যার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ সেবার মানবিক মানোন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থায় গঠনমূলক সংস্কার আনা হয়েছে।

সংশোধিত অধ্যাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো—ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা কোনো পরিস্থিতিতেই বন্ধ করা যাবে না। ধারা ৯৭-এ অন্তর্ভুক্ত এই বিধান নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার একটি দৃঢ় আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অজুহাতে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে সমালোচিত হয়েছিল। নতুন এই বিধান সেই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রকে একটি অধিকতর মানবাধিকারবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

সংশোধনের আরেকটি বড় দিক হলো বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসির স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ২০১০ সালের বিতর্কিত সংশোধনের কাঠামো থেকে সরে এসে এবার মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির ক্ষমতা ও কার্যপরিধির মধ্যে ভারসাম্য আনা হয়েছে। আগে সব ধরনের লাইসেন্স ইস্যুর অনুমোদন সরাসরি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হলেও নতুন সংশোধনী অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু লাইসেন্সে মন্ত্রণালয় স্বাধীন গবেষণা বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টাডির ভিত্তিতে অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করবে। অন্যান্য সব লাইসেন্স ইস্যুর এখতিয়ার আবারও বিটিআরসির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে একটি জবাবদিহিতা কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যা কমিশনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

টেলিযোগাযোগ খাতকে বিনিয়োগবান্ধব করতে লাইসেন্স প্রক্রিয়ায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আবেদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সময় কমিয়ে আনা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী আইনে উল্লেখিত উচ্চ জরিমানা ও পুনরাবৃত্তিমূলক জরিমানার হার কমানো হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই পরিবর্তন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক হবে।

বিটিআরসির কার্যক্রমকে জনমুখী ও অংশগ্রহণমূলক করতে সংশোধিত অধ্যাদেশে প্রতি চার মাসে গণশুনানি আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব গণশুনানির সিদ্ধান্ত ও অগ্রগতি কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে এবং স্বার্থের সংঘাত বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট রোধে স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এতে করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের মতামত প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

নাগরিক গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায়ও সংশোধিত অধ্যাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। সিম ও ডিভাইস রেজিস্ট্রেশনের তথ্য ব্যবহার করে কোনো নাগরিককে নজরদারি করা বা অযথা হয়রানি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই বিধান প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার চর্চার আশঙ্কা কমাবে বলে মনে করছেন তথ্যপ্রযুক্তি আইন বিশেষজ্ঞরা।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় বহুল আলোচিত ‘স্পিচ অফেন্স’ সংক্রান্ত ধারা পুনর্গঠন করা হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ধারাবাহিকতায় কেবল সহিংসতার আহ্বানকেই অপরাধের আওতায় রাখা হয়েছে। ফলে ভিন্নমত বা সমালোচনামূলক বক্তব্যের কারণে হয়রানির আশঙ্কা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংশোধিত অধ্যাদেশে আপিল ও সালিশ ব্যবস্থার স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে, যাতে টেলিযোগাযোগ সেবাসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত ও ন্যায্যভাবে নিষ্পত্তি করা যায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আইনানুগ ইন্টারসেপশনের সংজ্ঞা ও পরিধি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, যা বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের মানদণ্ড অনুসরণ করবে।

এই কেন্দ্রের মাধ্যমে কেবল বিচারিক বা জরুরি আইনানুগ ইন্টারসেপশনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। জাতীয় নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জরুরি প্রাণরক্ষা কিংবা বিচারিক তদন্তের প্রয়োজন ছাড়া কোনো ধরনের ইন্টারসেপশন অনুমোদিত হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন গঠিত কেন্দ্র নিজে কোনো ইন্টারসেপশন পরিচালনা করতে পারবে না; এটি কেবল কারিগরি সহায়তা দেবে। এই সংশোধনের মাধ্যমে এনটিএমসি বা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে, যা অতীতে রাজনৈতিক নজরদারি ও অপব্যবহারের অভিযোগে সমালোচিত ছিল।

আইনানুগ ইন্টারসেপশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আধা-বিচারিক কাউন্সিল ও সংসদীয় তদারকির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এই কাউন্সিলে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। বেআইনি ইন্টারসেপশনের বিরুদ্ধে নাগরিকরা কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। পাশাপাশি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রতি বছর ইন্টারসেপশন সংক্রান্ত একটি জাতীয় বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, যেখানে কার্যক্রম, বাজেট ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিবরণ থাকবে।

ইমেজ ও ভয়েস প্রোটেকশন, সিম ডেটা ও ডিভাইস ডেটা সুরক্ষার বিধান যুক্ত করে সংশোধিত অধ্যাদেশকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। জাতিসংঘ, আইটিইউসহ আন্তর্জাতিক উত্তম অনুশীলনের আলোকে প্রণীত এই বিধান বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল শাসনব্যবস্থাকে একটি নতুন মানদণ্ডে উন্নীত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, ইন্টারনেট বন্ধের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশের এই সংশোধন দেশের ডিজিটাল অধিকার, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি কতটা কার্যকর হয়, সেদিকে এখন দেশবাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত