প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা যেন পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে স্বাগত জানাতে ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ, বিশেষ করে উত্তরা, আবদুল্লাহপুর, বিমানবন্দর সড়ক, কুড়িল ও ৩০০ ফিট এলাকায় লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা যায়। এই বিপুল জনসমাগমের মধ্যেই মানবিক দায়িত্ববোধ ও পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকে মাঠে নামে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ২৫টি মেডিকেল টিম মোতায়েন করে সংগঠনটি।
ড্যাবের এই উদ্যোগ শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি আনুষঙ্গিক অংশ নয়, বরং তা মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকেই চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এলাকা ও রাজধানীতে প্রবেশের প্রধান সড়কগুলোতে টিমগুলো অবস্থান নেয়, যাতে দূরদূরান্ত থেকে আগত মানুষদের কোনো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে না হয়। প্রচণ্ড ভিড়, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, ক্লান্তি ও শীতের প্রভাব—সব মিলিয়ে অনেকের মধ্যেই দেখা দেয় হঠাৎ অসুস্থতা। ঠিক সেই মুহূর্তগুলোতেই ড্যাবের চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবকরা হয়ে ওঠেন ভরসার নাম।
উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় দায়িত্বে থাকা ড্যাব বারডেম শাখার জয়েন্ট সেক্রেটারি ডা. আহসান হাবিব রাফি জানান, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষদের নিরাপদ ও সুস্থ রাখা। তিনি বলেন, সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে গ্যাসজনিত সমস্যা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা এবং হালকা আঘাতপ্রাপ্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
রাজধানীর প্রতিটি টিমে ছিলেন অভিজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স এবং নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবকরা। তাঁরা কেবল চিকিৎসা দেননি, বরং রোগীদের মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছেন, বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলেছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা অনেক নেতাকর্মী জানান, চিকিৎসা টিমগুলোর উপস্থিতি তাঁদের ভীষণভাবে স্বস্তি দিয়েছে। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেও পাশে যে চিকিৎসক আছেন—এই বিশ্বাসই তাঁদের মানসিক শক্তি জুগিয়েছে।
তারেক রহমানের দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরা বিএনপি ও এর সমর্থকদের কাছে আবেগঘন এক অধ্যায়। এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজধানীতে যে বিশাল জনস্রোত তৈরি হয়, তা সামাল দেওয়া প্রশাসন ও আয়োজকদের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জিং ছিল, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটিও ছিল বড় উদ্বেগের বিষয়। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই ড্যাবের উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার এমন সমন্বয় সচরাচর দেখা যায় না, যা এই উদ্যোগকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিএনপি নেতারাও ড্যাবের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, রাজনীতির পাশাপাশি মানবিক কাজের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই একটি সংগঠনের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে। অনেকেই বলেছেন, এই চিকিৎসা কার্যক্রম রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার বার্তা দিয়েছে। কারণ এখানে চিকিৎসা পেয়েছেন সবাই—দল-মত নির্বিশেষে।
ড্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভবিষ্যতেও যেকোনো বড় জনসমাগম বা দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে তারা মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। চিকিৎসক সমাজের দায়িত্ব শুধু হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এই বিশ্বাস থেকেই তারা রাজপথে নেমে আসে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ড্যাব আবারও প্রমাণ করেছে, সংকটের মুহূর্তে মানবিকতার ডাক উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
ঢাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মেডিকেল টিমগুলোর কর্মব্যস্ততা দিনভর অব্যাহত থাকে। দুপুরের দিকে ভিড় আরও বাড়লে চিকিৎসা সেবার চাপও বৃদ্ধি পায়। তবু কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। বরং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতিটি টিম দায়িত্ব পালন করেছে। উপস্থিত অনেক সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ড্যাবের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং একে ‘মানবিক রাজনীতির দৃষ্টান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে আসা লাখো মানুষের ভিড়ে ড্যাবের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা শুধু একটি সহায়ক কার্যক্রম নয়, বরং এটি একটি বার্তা—রাজনীতির উত্তাপের মধ্যেও মানবিকতা ও পেশাদারিত্ব অটুট রাখা সম্ভব। এই উদ্যোগ রাজধানীর কর্মব্যস্ত রাজপথে যেমন স্বস্তি এনে দিয়েছে, তেমনি সমাজে দায়িত্বশীলতার একটি ইতিবাচক নজির স্থাপন করেছে।