তালাবদ্ধ ঘরে আগুনে নিভে গেল দুই বোনের জীবন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৮ বার
তালাবদ্ধ ঘরে আগুনে নিভে গেল দুই বোনের জীবন

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লক্ষ্মীপুরে বিএনপির এক নেতার বসতঘরে তালা লাগিয়ে আগুন দেওয়ার নৃশংস ঘটনায় এক পরিবারের ওপর নেমে এসেছে চরম শোক ও বিভীষিকা। ছোট মেয়ের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় বড় মেয়ের মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে গেছে। আগুনে দগ্ধ হয়ে জাতীয় বার্ণ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা সালমা আক্তার স্মৃতি (১৭) বুধবার রাতে মারা গেছেন। এর আগে একই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় তার ছোট বোন আয়েশা আক্তার (৮)। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় রাজনৈতিক সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা ও মানবিক বিপর্যয়ের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।

নিহত স্মৃতি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী বেলাল হোসেনের বড় মেয়ে। বেলাল হোসেন নিজেও ওই অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হন। তার সংসারের স্বাভাবিক জীবন মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ১৯ ডিসেম্বর রাতের সেই ভয়াল ঘটনায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতে সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামের সুতারগোপ্তা এলাকায় দুর্বৃত্তরা বেলাল হোসেনের বসতঘরের বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। এরপর ঘরের চারপাশে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঘরের ভেতরে, যেখানে তখন পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছিলেন।

আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে নেয় ঘরের আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও স্বাভাবিক জীবনের সব চিহ্ন। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হয় পরিবারের শিশুদের জন্য। আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় আট বছরের আয়েশা আক্তার। তার বড় বোন স্মৃতি, মেজো বোন সায়মা আক্তার বিথি (১৪) এবং বাবা বেলাল হোসেন গুরুতর দগ্ধ হন। স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে প্রথমে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় স্মৃতি ও বিথিকে দ্রুত ঢাকার জাতীয় বার্ণ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্মৃতির শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। আইসিইউতে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর সঙ্গে তার লড়াইয়ের গল্প। অন্যদিকে, বিথির শরীরের প্রায় ২ শতাংশ দগ্ধ হলেও তার অবস্থা তুলনামূলক ভালো ছিল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে তাকে ভর্তি হওয়ার পরদিনই হাসপাতাল থেকে ছাড় দেওয়া হয়। তবে পরিবারের আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা স্মৃতি শেষ পর্যন্ত সেই লড়াইয়ে জয়ী হতে পারেননি। বুধবার রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চরমনসা গ্রামসহ পুরো ভবানীগঞ্জ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রতিবেশী ও স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এক রাতে একই পরিবারের দুই কন্যাসন্তানের এমন করুণ মৃত্যু শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এটি কোনো সাধারণ অগ্নিকাণ্ড নয়; এটি পরিকল্পিত ও নৃশংস হামলা, যার বিচার না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।

ঘটনার পরদিনই নিহত আয়েশার বাবা বেলাল হোসেন বাদী হয়ে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আগুনে পুড়ে আয়েশার মৃত্যু হয় ঘটনাস্থলেই। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বড় বোন স্মৃতিও মারা গেছে। নিহতদের বাবা মামলা করেছেন এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে তিনটি তালা উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি তালা লক অবস্থায় এবং একটি খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে প্রাথমিক তদন্তে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানোর সরাসরি আলামত পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। এই তথ্য ঘিরে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তারা বলছেন, ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় আগুন লাগার বিষয়টি স্বাভাবিক কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না। দ্রুত প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ বা পূর্বশত্রুতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বেলাল হোসেন স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। ফলে এই হামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, তা তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে পুলিশ এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন মহল বলছেন, একটি পরিবারের ওপর এমন বর্বর হামলা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিশু ও কিশোরীদের এমন করুণ মৃত্যু শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতাই নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তারা অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

একদিকে চিকিৎসাধীন বাবা বেলাল হোসেনের শারীরিক যন্ত্রণা, অন্যদিকে দুই মেয়েকে হারানোর অসহনীয় মানসিক বেদনা—সব মিলিয়ে পরিবারটি এখন চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছে। স্বজনরা বলছেন, স্মৃতি ছিল পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী সন্তান। পড়াশোনার পাশাপাশি সে ভবিষ্যতে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখত। সেই স্বপ্ন, সেই সম্ভাবনা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

লক্ষ্মীপুরের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, সহিংসতা ও অপরাধের শিকার হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিরপরাধ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা। দুই বোনের করুণ মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, এটি পুরো জাতির জন্য এক গভীর বেদনার নাম। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগোয় এবং এই নৃশংস ঘটনার দায়ীদের আদৌ আইনের আওতায় আনা যায় কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত