প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে ঘন কুয়াশার মধ্যে দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে চাঁদপুর সদরের হরিনা এলাকায়। দুর্ঘটনার সময় নদীপথে দৃশ্যমানতা ছিল অত্যন্ত কম, যার ফলে নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে দুর্ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে মেঘনা নদীর হরিনা অংশে যাত্রীবাহী লঞ্চ জাকির সম্রাট-৩ ও অ্যাডভেঞ্চার-৯ একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ওই সময় নদীতে ঘন কুয়াশা থাকায় কয়েক হাত দূরের কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, দিক নির্ণয়ে বিভ্রান্তি ও পর্যাপ্ত সতর্কতা না থাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে।
চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএর উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) বাবু লাল বৈদ্য জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, কুয়াশার কারণে দুই লঞ্চের চালকই একে অপরকে সময়মতো দেখতে পাননি। ফলে সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই আমরা ঘটনাস্থলে লোক পাঠাই। এতে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে লঞ্চ দুটি কোন কোন গন্তব্যে যাচ্ছিল, সে তথ্য এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ কারণে নিহতদের নাম-পরিচয়ও তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।”
দুর্ঘটনার পরপরই নদীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের শব্দে অনেক যাত্রী ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। কেউ কেউ হুড়োহুড়ি করে লঞ্চের ভেতর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। আহত যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজনকে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। গুরুতর আহতদের চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, শীত মৌসুমে মেঘনা নদীতে প্রায়ই ঘন কুয়াশা পড়ে। রাত ও ভোরের দিকে কুয়াশার ঘনত্ব আরও বেড়ে যায়। এ সময় নৌযান চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে নৌযানগুলো নির্ধারিত নৌপথ ঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারে না। ফলে সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ে। জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, শীত শুরুর পর থেকে মেঘনায় নৌযান চলাচলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে অনেক সময় তা মানা হয় না।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিহতদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। চাঁদপুর লঞ্চঘাট ও আশপাশের এলাকায় অনেক মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। তারা প্রিয়জনদের খোঁজে বিভিন্ন হাসপাতাল ও নৌঘাটে যোগাযোগ করছেন। এখনো নিহতদের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীত মৌসুমে নদীপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নতুন নয়। প্রতিবছরই কুয়াশার কারণে বিভিন্ন স্থানে লঞ্চ, কার্গো ও ট্রলারের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় নৌযানে পর্যাপ্ত রাডার বা আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় চালকরা কেবল অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে চলাচল করেন। কিন্তু ঘন কুয়াশায় সেই অভিজ্ঞতাও অনেক সময় কাজে আসে না।
এ বিষয়ে এক নৌযান চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “রাতে কুয়াশা খুব বেশি হলে নৌযান থামিয়ে রাখা উচিত। কিন্তু যাত্রী ও সময়ের চাপের কারণে অনেক সময় চালাতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।” তার মতে, নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর নির্দেশনা ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো কঠিন।
চাঁদপুর নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে একটি প্রাথমিক তদন্ত শুরু করা হয়েছে। লঞ্চ দুটির ফিটনেস, চালকদের লাইসেন্স ও দুর্ঘটনার সময়ের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে নদীপথে চলাচলের জন্য আলাদা নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। কুয়াশা বেশি হলে নৌযান চলাচল সীমিত করা, আধুনিক নেভিগেশন সরঞ্জাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিত মহড়া চালানোর মাধ্যমে চালকদের প্রস্তুত রাখা জরুরি। তারা মনে করেন, এসব ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এদিকে নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। পরিচয় শনাক্তের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে প্রশাসন।
মেঘনা নদীতে এই দুর্ঘটনা আবারও নদীপথে যাত্রী পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ নৌপথে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে লঞ্চ অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।
চাঁদপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নৌযান দুর্ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির কারণই নয়, এটি পরিবারগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও আর্থিক প্রভাব ফেলে। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এই ক্ষতি অপূরণীয়। তারা দ্রুত তদন্ত ও ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
সবশেষে বলা যায়, মেঘনা নদীতে কুয়াশার মধ্যে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে দুইজনের মৃত্যু একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। এটি আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, নদীপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। যথাযথ পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়মের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমাতে।