প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটে শৈত্য প্রবাহের তীব্রতায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। টানা তিন দিন ধরে হাড় কাঁপানো শীত ও কনকনে ঠান্ডায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে ছিন্নমূল, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে ছোট শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা, যাদের জন্য এই তীব্র শীত মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
লালমনিরহাটে শীতের প্রকোপ সাধারণত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয়। তবে চলতি মৌসুমে শৈত্য প্রবাহের তীব্রতা যেন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শুক্রবার সকাল ৬টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ঘন কুয়াশা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভোর থেকেই ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে পুরো জেলা। সূর্যের দেখা মিলছে না বললেই চলে। দিনের বেলা সূর্য উঠলেও তার তাপ অনুভূত হচ্ছে না। বরং বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতা আরও প্রখর হয়ে উঠছে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ঠান্ডার অনুভূতি কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও কৃষিশ্রমিকদের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ না থাকায় উপার্জন বন্ধ, আর উপার্জন বন্ধ হওয়ায় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ছে অনেক পরিবারের জন্য।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, ছিন্নমূল মানুষজন খোলা আকাশের নিচে কিংবা রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, বাজারের পাশে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ পুরোনো কাপড়, প্লাস্টিক বা পলিথিন জড়িয়ে শরীর ঢাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কনকনে ঠান্ডার কাছে এসব ব্যবস্থা যে খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না, তা তাদের কাঁপতে থাকা শরীর দেখলেই বোঝা যায়। বিশেষ করে রাতের বেলা শীতের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়, যা অসহায় মানুষের জন্য ভয়াবহ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
শিশু ও বয়স্কদের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। জেলার বিভিন্ন গ্রাম ও চরাঞ্চলে অনেক পরিবার রয়েছে, যাদের কাছে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই। ছোট শিশুরা শীতজনিত সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও জ্বরের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ঠান্ডাজনিত শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের সমস্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
শৈত্য প্রবাহের প্রভাব পড়েছে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও। ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক ও মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সকালে ও রাতে যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করছে। কোথাও কোথাও কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে চালকদের। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। এতে বাজারঘাটে ক্রেতার উপস্থিতিও কমে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়ে।
কৃষিক্ষেত্রেও শীতের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। লালমনিরহাটের অনেক কৃষক শীতকালীন সবজি চাষের সঙ্গে যুক্ত। অতিরিক্ত শীত ও কুয়াশার কারণে ক্ষেতের সবজি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আলু, টমেটো, ফুলকপি ও বাঁধাকপির মতো ফসল ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে কৃষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সকালে ঘন কুয়াশা থাকায় ক্ষেতের কাজ শুরু করতেও দেরি হচ্ছে, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এমন তীব্র শীত তারা বহু বছর দেখেননি। অনেকেই জানিয়েছেন, দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরেই থাকতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া বাইরে বের হওয়া যাচ্ছে না। যারা দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই শীত যেন অভিশাপ হয়ে এসেছে। কাজ না করলে যেমন আয় নেই, তেমনি ঠান্ডায় কাজ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এদিকে শীত মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। অনেক দুর্গম চর ও গ্রামাঞ্চলে এখনও শীতবস্ত্র পৌঁছায়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীরা বলছেন, দ্রুত আরও শীতবস্ত্র বিতরণ না করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও দরিদ্র মানুষের জন্য কম্বল, সোয়েটার ও গরম কাপড়ের জরুরি প্রয়োজন।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই শৈত্য প্রবাহ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তাপমাত্রা সামান্য ওঠানামা করলেও শীতের তীব্রতা কমার সম্ভাবনা কম। ফলে মানুষকে আরও কিছুদিন এই দুর্ভোগ সহ্য করতে হতে পারে। তারা পরামর্শ দিয়েছেন, শীতজনিত রোগ থেকে বাঁচতে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নিতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া ভোর কিংবা গভীর রাতে বাইরে না বের হওয়াই ভালো।
সব মিলিয়ে, লালমনিরহাটে শৈত্য প্রবাহ এখন কেবল একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়, বরং একটি মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। কনকনে ঠান্ডায় যেখানে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই ব্যাহত, সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের বেঁচে থাকাই হয়ে উঠেছে কঠিন। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে শীতবস্ত্র বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। নইলে এই শৈত্য প্রবাহ লালমনিরহাটের মানুষের জন্য আরও বড় দুর্ভোগ বয়ে আনতে পারে।