সংসদ নির্বাচনে ব্যয়সীমা: বাস্তবতা না কি কাগুজে নিয়ম?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৫১ বার
সংসদ নির্বাচনে ব্যয়সীমা: বাস্তবতা না কি কাগুজে নিয়ম?

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বিধি অনুযায়ী, একজন প্রার্থী তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন। কাগজে-কলমে এই সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনে অর্থের প্রভাব কমানো এবং তুলনামূলকভাবে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এই ব্যয়সীমা নিজেই এক গভীর বৈষম্য ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে—এটি আদৌ বাস্তবসম্মত কি না, নাকি শুধুই একটি আনুষ্ঠানিক নিয়ম, যার বাস্তব প্রয়োগ নেই।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। কিন্তু এই বিপুল ভোটারসংখ্যা সমানভাবে ৩০০ সংসদীয় আসনে বণ্টিত নয়। কোনো কোনো আসনে ভোটার সংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়ে গেছে, আবার কোনো কোনো আসনে তা আড়াই লাখেরও কম। এর ফলে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা ব্যয়ের হিসাব কষলে দেখা যায়, প্রার্থীদের ব্যয়ের বৈধ সীমার মধ্যেই তৈরি হচ্ছে পাহাড়সম বৈষম্য। উদাহরণ হিসেবে গাজীপুর-২ আসনের কথা বলা যায়, যেখানে ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার। নিয়ম অনুযায়ী সেখানে একজন প্রার্থী প্রায় ৮০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন। অথচ ঝালকাঠি-১ আসনে ভোটার সংখ্যা মাত্র ২ লাখ ২৮ হাজার হওয়ায় সেখানে প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা।

ইসির ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করলে আরও স্পষ্ট হয় এই বৈষম্যের চিত্র। গাজীপুর-২ ছাড়াও ঢাকা-১৯, গাজীপুর-১ এবং নোয়াখালী-৪ আসনে ভোটার সংখ্যা সাত লাখের বেশি। এসব আসনে ব্যয়ের সীমা ৭০ থেকে ৮৪ লাখ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, দেশের প্রায় ২০টি আসনে ভোটার সংখ্যা তিন লাখের নিচে, যেখানে ব্যয়ের সীমা ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মধ্যেই আটকে থাকছে। আবার ৩০০ আসনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে ভোটার সংখ্যা তিন থেকে চার লাখের মধ্যে, কোথাও চার থেকে পাঁচ লাখ, কোথাও পাঁচ থেকে ছয় লাখ। এই বিশাল ব্যবধান নির্বাচনি ব্যয়ের ক্ষেত্রে সমতা তো দূরের কথা, বরং প্রার্থীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থবিত্তের প্রভাব কমিয়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই উদ্দেশ্য অনেকটাই অধরাই থেকে গেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, কাগজে-কলমে ব্যয়ের সীমা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায় না। তাঁর মতে, বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় টাকার প্রভাব এতটাই প্রবল যে ভোটারপ্রতি ১০ টাকার হিসাব অনেকটা উপহাসের মতো শোনায়। তিনি আরও বলেন, আসনভেদে ভোটার সংখ্যার এই বিশাল তারতম্য প্রার্থীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে এবং সঠিক সীমানা পুনর্নির্ধারণ না হওয়ায় এই বৈষম্য দিনের পর দিন আরও প্রকট হচ্ছে।

এই ব্যয়সীমা কার্যকর না হওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে নজরদারির ঘাটতি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, সমস্যা আইনের অভাবে নয়, বরং প্রয়োগের অভাবে। তাঁর ভাষায়, ইসি ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে ঠিকই, কিন্তু প্রার্থীরা হলফনামায় যে ব্যয়ের হিসাব দেন, তা যাচাই করার মতো শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থা ইসির হাতে নেই। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও অনেক প্রার্থী সহজেই পার পেয়ে যান। কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না থাকায় এই নিয়ম কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

আইন অনুযায়ী, নির্বাচনি ব্যয়সীমা লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই শাস্তির নজির খুবই বিরল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাস্তির ভয় না থাকলে ব্যয়সীমা কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যায়। নির্বাচনের মাঠে পোস্টার, ব্যানার, শোডাউন, মাইকিং, যানবাহন ব্যবহার, কর্মী বাহিনী পরিচালনা এবং ভোটের দিন কেন্দ্রকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তা ঘোষিত হিসাবের সঙ্গে মেলে না—এ কথা সবাই জানেন, কিন্তু প্রমাণের অভাবে খুব কম ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ইসি সচিবালয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, প্রশাসনিক অখণ্ডতা ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে আসনগুলোতে ভোটার সংখ্যার সমতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের খোঁজে মানুষ শহরমুখী হওয়ায় গাজীপুর, ঢাকা বা আশপাশের আসনগুলোতে ভোটার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। বিপরীতে, অনেক গ্রামীণ এলাকায় জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। এই বাস্তবতায় আসন পুনর্বিন্যাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং ফল হিসেবে ভোটার সংখ্যার বৈষম্য রেখেই সংসদীয় আসন বিন্যাস করতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্বাচনি ব্যয়ের সীমায়।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই ব্যয়ের বৈষম্য প্রার্থীদের মানসিক চাপও বাড়াচ্ছে। কম ভোটারের আসনে সীমিত অর্থে প্রচারণা চালাতে গিয়ে অনেক প্রার্থী নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। আবার বড় ভোটারসংখ্যার আসনে বিপুল ব্যয়ের সুযোগ থাকায় সেখানে অর্থশালী প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। এতে রাজনীতিতে টাকার প্রভাব কমার বদলে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

এবারের নির্বাচনে ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২৫৮২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থী ও আসনভেদে ব্যয়ের এই তারতম্যের মধ্যে ইসির পক্ষে সবার ব্যয়ের হিসাব নিবিড়ভাবে তদারকি করা যে বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চ্যালেঞ্জ থাকলেও কার্যকর নজরদারি ছাড়া নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—সংসদ নির্বাচনে ইসির নির্ধারিত ব্যয়সীমা কি আদৌ বাস্তবতা বদলাতে পারবে, নাকি এটি কেবল একটি কাগুজে নিয়ম হয়েই থেকে যাবে? ব্যয়ের সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি যদি কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছ হিসাব যাচাই এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে এই নিয়ম নির্বাচনি মাঠে কোনো বাস্তব প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গণতন্ত্রের স্বার্থে অর্থের প্রভাব কমানো যে জরুরি, তা সবাই মানলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে—এ কথাই আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com