রাজধানীর ৯৮ বাস রুট কমে হচ্ছে ৩২

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
রাজধানীর ৯৮ বাস রুট কমে হচ্ছে ৩২

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার সড়কে প্রতিদিনের যাতায়াত অনেক মানুষের জন্য সময়, অর্থ ও মানসিক চাপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতা। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে বের হওয়া যাত্রী—প্রায় সবাইকে কোনো না কোনো সময় বাসের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, নির্দিষ্ট স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা কিংবা যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাসের মধ্যে আগে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা কখনো কখনো তৈরি করে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিও। রাজধানীর গণপরিবহনের এই দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা কমাতে এবার বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর বিদ্যমান ৯৮টি বাস রুট কমিয়ে ৩২টি রুটে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি রুটে একটি কোম্পানির অধীনে সব বাস পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ একই করিডরে একাধিক কোম্পানির মধ্যে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার অধীনে বাস পরিচালনার মাধ্যমে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করা হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর বাস চলাচলের ধরন, যাত্রী ওঠানামা এবং সড়কে বাসের প্রতিযোগিতার চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে ছয় মাসের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের একটি পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। তবে পরিবহনব্যবস্থা একটি গতিশীল কাঠামো হওয়ায় বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও আনা হতে পারে। এর অর্থ, ৩২টি রুটের কাঠামো নির্ধারণ করলেও যাত্রীচাহিদা, সড়কের সক্ষমতা, যানবাহনের সংখ্যা এবং বিভিন্ন এলাকার পরিবহন প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে কিছু সমন্বয় করা হতে পারে।

রাজধানীর বাসব্যবস্থায় রুট পুনর্বিন্যাসের ধারণাটি অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার গণপরিবহনকে নির্দিষ্ট রুট, কোম্পানি ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর লক্ষ্য ছিল একদিকে বাস মালিকদের মধ্যে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা কমানো, অন্যদিকে যাত্রীদের জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক ও নির্ভরযোগ্য পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করা। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন কারণে এমন উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়নি। এবার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতির বিষয়টি সামনে রেখে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ডিটিসিএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এর আগে ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে একক কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে পরিবহন মালিকদের অংশগ্রহণ ও সম্মতির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ ঢাকার বাসব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে বাস পরিচালনা করে আসছে। তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ, বিনিয়োগ, যানবাহনের মালিকানা এবং দৈনিক আয়—সবকিছুর সঙ্গে রুট পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহেই দুটি রুটে একক কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর একটি রুট আজিমপুর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে বিমানবন্দর দিয়ে গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত করার কথা রয়েছে। দীর্ঘ এই করিডরে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় বাস চলাচল শুরু হলে যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট রুটে বাস পাওয়ার বিষয়টি সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বাসের সংখ্যা, চলাচলের সময় এবং স্টপেজ ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্য একটি রুট হিসেবে মোহাম্মদপুর-চট্টগ্রাম রোড এবং মিরপুর-মাওয়া করিডর নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব করিডরে যাত্রী চলাচলের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে। তবে কোন রুটে কতটি বাস প্রয়োজন, কোন ধরনের যানবাহন ব্যবহার করা হবে এবং কীভাবে বাসের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে—এসব বিষয় বাস্তবায়নের আগে আরও বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

বাস রুট পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাস শনাক্ত করার কাজও শুরু হয়েছে। সরকারি নির্দেশনার পর পরিবহন মালিক সমিতি রাজধানীর ২০টি পয়েন্টে এ বিষয়ে কাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার সড়কে চলাচলকারী অনেক বাসের বয়স ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং গণপরিবহনের মান উন্নত করতে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ধীরে ধীরে ব্যবস্থার বাইরে আনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করাও নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে অনেক বাস রাস্তার মাঝখানে বা যেখানে যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকেন, সেখানেই থামিয়ে দেওয়া হয়। এতে পেছনের যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানোর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে একদিকে যাত্রী ওঠানামা আরও নিরাপদ হতে পারে, অন্যদিকে সড়কে বাসের অপ্রয়োজনীয় থামার কারণে সৃষ্ট যানজটও কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো পরিবহন মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে। ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম জানিয়েছেন, ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হলেও এর জন্য সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় মালিকদের বাস পরিচালনার সুযোগ, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, আয় বণ্টন এবং লোকসানের ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়ে একটি স্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, শুধু রুট কমিয়ে দিলেই রাজধানীর গণপরিবহনের সমস্যা সমাধান হবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল, মালিকদের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং কার্যকর নজরদারি। কারণ বাস মালিকদের আয় যদি নতুন ব্যবস্থায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে পরিকল্পনাটি দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন হতে পারে। একইভাবে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়া, বাসের সংখ্যা, সময়সূচি ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিও জরুরি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামসুল হক মনে করেন, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট করিডরে লেগুনাসহ ছোট যানবাহনের চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ বড় বাসের রুট নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলেও একই পথে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছোট যানবাহন চলাচল করলে সামগ্রিক পরিবহনব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা তৈরি নাও হতে পারে। ফলে রুট পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি পুরো করিডরের যানবাহন ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজন হবে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামানের মতে, মালিকদের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে এই ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব। এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত গণপরিবহন সংস্কারে মালিক, শ্রমিক, সরকার ও যাত্রী—সব পক্ষের স্বার্থের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরির প্রয়োজনীয়তাই সামনে এসেছে।

রাজধানীর লাখো মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের সঙ্গে বাসব্যবস্থা সরাসরি জড়িত। একটি বাস দেরি করলে কিংবা রাস্তায় অযথা দাঁড়িয়ে থাকলে তার প্রভাব শুধু একজন যাত্রীর ওপর পড়ে না; একই সঙ্গে পেছনে তৈরি হতে পারে দীর্ঘ যানজট। আবার কয়েকটি বাস একই যাত্রীর জন্য প্রতিযোগিতা করলে চালকদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেক করা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন বা রাস্তার মাঝখানে থামার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে একটি নিয়মতান্ত্রিক বাসব্যবস্থা শুধু সময় বাঁচানোর বিষয় নয়, এটি সড়ক নিরাপত্তা ও নগরজীবনের স্বস্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যাত্রীদের প্রত্যাশাও কম নয়। তারা চান নির্দিষ্ট সময়ে বাস পাওয়া, নির্ধারিত স্টপেজে ওঠানামার সুযোগ, তুলনামূলক নিরাপদ যাত্রা এবং ভাড়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা। একই সঙ্গে বাসে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, প্রতিযোগিতামূলকভাবে বাস চালানো এবং যাত্রী পাওয়ার জন্য যেখানে-সেখানে থামার প্রবণতা কমানোর বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

তবে ৯৮টি রুট থেকে ৩২টি রুটে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নগরীর বিস্তৃত ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখা জরুরি। ঢাকার একেক এলাকার যাত্রীচাহিদা একেক রকম। কোথাও অফিসগামী যাত্রী বেশি, কোথাও শিক্ষার্থী, আবার কোথাও আবাসিক এলাকার মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত বেশি। তাই শুধু রুটের সংখ্যা কমানোর পরিবর্তে যাত্রীচাহিদা, সংযোগ, ট্রান্সফার সুবিধা এবং শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ ঢাকার দীর্ঘদিনের গণপরিবহন সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনাটি কতটা বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কতটা সম্পৃক্ত করা হয়, যাত্রীস্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পায় এবং ব্যবস্থাটির ওপর নজরদারি কতটা কার্যকর হয় তার ওপর। ৯৮টি রুট থেকে ৩২টি রুটে যাত্রা কেবল সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি সফল হলে রাজধানীর প্রতিদিনের যাতায়াত সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে যদি নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ ও যাত্রীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা থাকে, তাহলে ঢাকার দীর্ঘদিনের গণপরিবহন ভোগান্তি কমানোর ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com