প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে চায় বাংলাদেশ। উন্নয়ন প্রকল্পে শুধু ঋণ নিয়ে অর্থায়নের পরিবর্তে এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার, যেখানে বাংলাদেশ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অংশীদার হিসেবে প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করবেন এবং সম্ভাব্য মুনাফা ও ঝুঁকি ভাগ করে নেবেন। বৈদেশিক ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই অর্থায়নের এই পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্পর্ক ও সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে অর্থায়নের ধরনে পরিবর্তন আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সার্বভৌম ঋণসহ বিভিন্ন ঋণভিত্তিক অর্থায়নের ওপর যে নির্ভরতা রয়েছে, তা কমিয়ে ইকুইটি বা মালিকানাভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতায় যৌথ বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে অর্থায়নের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখনো কোন প্রকল্পে কী পরিমাণ বিনিয়োগ হবে, দুই পক্ষের অংশীদারত্বের অনুপাত কত হবে কিংবা নতুন কাঠামো কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় এই উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং উৎপাদনশীল খাত সম্প্রসারণে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি অর্থায়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি বাজেটের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন ব্যবহার করা হয়েছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ঋণের অর্থ ব্যবহার করে নির্মিত প্রকল্পের বিপরীতে নির্ধারিত সময়ে সুদ ও আসল পরিশোধের দায় সরকারের ওপর থাকে। ফলে নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় উন্নয়নের প্রয়োজনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও বিবেচনা করতে হয়।
ঋণ ও ইকুইটি বিনিয়োগের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ঋণের ক্ষেত্রে অর্থগ্রহীতাকে চুক্তি অনুযায়ী সুদসহ মূল অর্থ ফেরত দিতে হয়। কোনো প্রকল্প প্রত্যাশিত আয় করতে না পারলেও ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সাধারণত বহাল থাকে। অন্যদিকে, ইকুইটি বিনিয়োগে বিনিয়োগকারী কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের মালিকানার অংশীদার হন। প্রকল্প সফল হলে তিনি মুনাফার অংশ পেতে পারেন, আবার প্রত্যাশিত ফল না এলে বিনিয়োগের ক্ষতির ঝুঁকিও বহন করতে হয়। ফলে উপযুক্ত প্রকল্পে ইকুইটি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে সরকারের ওপর নির্দিষ্ট ঋণ পরিশোধের চাপ কমতে পারে।
তবে ইকুইটি বিনিয়োগ মানেই বিনা খরচে অর্থ পাওয়া নয়। এ ধরনের বিনিয়োগে বিদেশি অংশীদার প্রকল্পের মালিকানা, পরিচালনা, আয় বণ্টন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা চাইতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্প থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশও তাঁর প্রাপ্য হতে পারে। তাই যৌথ বিনিয়োগের চুক্তি করার সময় দেশের স্বার্থ, বিনিয়োগের শর্ত, মুনাফা বণ্টন, ব্যবস্থাপনার অধিকার এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। ঋণ কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের শর্ত যেন দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পকারখানা স্থাপন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। চীনা অর্থায়ন ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের একাধিক অবকাঠামো প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে উৎপাদনশীল শিল্প, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ঋণনির্ভর প্রকল্পের পাশাপাশি অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
সরকারের দৃষ্টিতে, অর্থায়নের ধরন পরিবর্তনের একটি উদ্দেশ্য হলো উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়ানো। এতে শুধু অর্থের জোগান নয়, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং উৎপাদনসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, জ্বালানি অবকাঠামো ও লজিস্টিকস খাতে যথাযথ বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তবে এসব সুবিধা অর্জন নির্ভর করবে প্রকল্প নির্বাচন, বিনিয়োগের শর্ত এবং বাস্তবায়নের মানের ওপর।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। শুধু ঋণ নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে এমন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রকল্পের অংশীদার হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়িত হলে সরকারি অর্থের ওপর চাপ কিছুটা কমানোর পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশি পুঁজিকে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখতে নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির স্বচ্ছতা, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা, দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং আর্থিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ছে। দেশটি থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি এবং বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিষয় তুলে ধরে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক সহায়তা ও অনুদানের প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় উত্থাপন করা হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের আমদানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও সহায়তা প্রত্যাশা করছে সরকার। এ বিষয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং তাঁরা একমত হয়েছেন বলে তিনি জানান। তবে সম্ভাব্য সহায়তার পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি কিংবা কোন কোন খাতে সহায়তা দেওয়া হবে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তের কথা তিনি জানাননি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ওপর প্রভাব ফেলে। প্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়লে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় অনুদান, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সুযোগ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো সহায়তা চূড়ান্ত হয়েছে কি না, তার ভিত্তিতে নয়, বরং আনুষ্ঠানিক চুক্তি ও ঘোষণার ভিত্তিতেই এ ধরনের অর্থায়নের বাস্তব চিত্র মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি খাতে সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে কী ধরনের সহযোগিতা দেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে সম্ভাব্য অর্থায়নের পরিমাণ, প্রকল্পের ধরন কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ খাতের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং লাখো পরিবারের জীবিকা সরাসরি যুক্ত। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসল সংরক্ষণ, কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অর্থায়ন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যথাযথ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো ও পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হলে তার সুফল গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামগ্রিক বাজারে পড়তে পারে।
চীনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্থিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা এবং ইফাদের সঙ্গে কৃষি সহযোগিতার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে বৈদেশিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে বহুমুখী করার একটি সুযোগ রয়েছে। তবে এসব আলোচনার প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে সেগুলো কত দ্রুত বাস্তব চুক্তিতে রূপ নেয় এবং অর্থায়ন কীভাবে ব্যবহার করা হয়, তার ওপর। শুধু অর্থ সংগ্রহ নয়, বরং সেই অর্থ থেকে কতটা উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
সবশেষে বলা যায়, চীনের সঙ্গে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগ বাড়ানোর বাংলাদেশের উদ্যোগ অর্থায়ন কৌশলে একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারি ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগের শর্ত, মুনাফা বণ্টন, প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিশ্চিত না করে শুধু ঋণের পরিবর্তে ইকুইটি বিনিয়োগ বাড়ানো যথেষ্ট হবে না। স্বচ্ছ চুক্তি, কার্যকর তদারকি এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রকল্প নির্বাচন করা গেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত