এলসিতে স্থবিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্য যেন ‘আইসিইউতে’

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
এলসিতে স্থবিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্য যেন ‘আইসিইউতে’

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে এখনো দৃশ্যমান কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ঋণপত্র বা এলসি খোলার ও নিষ্পত্তির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। উদ্যোক্তাদের ভাষায়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এমন এক মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ব্যবসা যেন ‘আইসিইউতে’—চলমান, কিন্তু স্বাভাবিক গতিহীন। ব্যাক টু ব্যাক এলসি কমছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে নতুন বিনিয়োগের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই, এমনকি পেট্রোলিয়াম আমদানিতেও নেতিবাচক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই চিত্র আরও পরিষ্কার হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে রফতানি ক্রয়াদেশের বিপরীতে খোলা এলসি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ। শুধু এলসি খোলাই নয়, একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তিও কমেছে ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি—এই দুই সূচকই দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিচ্ছবি। সেখানে ধারাবাহিক পতন মানে অর্থনীতির গতি এখনো থমকে আছে।

এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে কারণ গত চার মাস ধরে দেশের রফতানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা হ্রাস, মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংকট—সব মিলিয়ে রফতানি খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় রফতানি আদেশ কমলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যাক টু ব্যাক এলসিতে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন রফতানি আদেশ না থাকলে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজনও কমে যায়, ফলে এলসি খোলার পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পায়।

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে এসব যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলার পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু নিষ্পত্তির দিক থেকে চিত্র একেবারেই হতাশাজনক। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি মূলত ইঙ্গিত দেয় যে যেসব এলসি খোলা হয়েছে, তার বড় অংশ এখনও বাস্তব আমদানিতে রূপ নিচ্ছে না, যা বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।

পোশাক খাত, যা দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস, সেখানেও একই রকম হতাশার সুর। বাংলাদেশের নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পখাতের জন্য প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির অবস্থাও ভালো নয়। তাঁর মতে, এলসি খোলার পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। এটি স্পষ্টভাবে বোঝায় যে শিল্পকারখানাগুলো পুরো সক্ষমতায় কাজ করছে না এবং উৎপাদন সম্প্রসারণের বদলে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী একই ধরনের বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে নতুন বিনিয়োগ করে কারখানা সম্প্রসারণের মতো পরিস্থিতি নেই। যেসব মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির তথ্য দেখা যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই নতুন বিনিয়োগ নয়, বরং পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলে কারখানাকে কোনোভাবে সচল রাখার চেষ্টা। অর্থাৎ এটি রিপ্লেসমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট, গ্রোথ ইনভেস্টমেন্ট নয়। এই বাস্তবতা দেশের শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছে।

অন্যদিকে, জ্বালানি খাতের চিত্রও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। বছর ব্যবধানে গত নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে পেট্রোলিয়াম আমদানিতে এলসি খোলা কমেছে ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, পেট্রোলিয়াম আমদানি কমার অর্থ কেবল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় নয়, বরং এটি শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতার ইঙ্গিতও বহন করে। কারণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকলে জ্বালানির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।

ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞরা মনে করছেন, বিনিয়োগ আস্থাহীনতাই এই স্থবিরতার মূল কারণ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়লেই মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও বাড়ে। কিন্তু বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কেউ বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩ থেকে ৫ শতাংশ হ্রাস খুব বড় কিছু নয়, বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। সামনে নির্বাচন থাকায় বছরের শুরুটা হয়তো আরও চ্যালেঞ্জিং হবে, পরে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তা সময়ই বলে দেবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেয়, তবে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের দায়ও তাদের ওপর বর্তাবে। সে ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্ত, আস্থার সংকট দূর করা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হলে এলসি খোলা বাড়তে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্যে তখন ধীরে ধীরে গতি ফিরবে এবং অর্থনীতির চাকা আবার সচল হতে শুরু করবে।

তবে সব খাতে যে একেবারেই নেতিবাচক চিত্র, তা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তি প্রায় ১ শতাংশ কমলেও এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানির প্রয়োজনীয়তার প্রতিফলন। তবে ভোগ্যপণ্যের এই সামান্য ইতিবাচক প্রবণতা সামগ্রিক অর্থনীতির স্থবিরতা ঢাকতে পারছে না।

সব মিলিয়ে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির বর্তমান চিত্র স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো মন্দার ঘেরাটোপে বন্দী। উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো সহজ পথ নেই। আপাতত এলসির পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে—দেশের অর্থনীতি এখনো শঙ্কামুক্ত নয়, আর ব্যবসা-বাণিজ্য যেন সত্যিই ‘আইসিইউতে’।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত