রুশ তেল ইস্যুতে ভারতের ওপর ৫০০% শুল্কে ট্রাম্পের সায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
রুশ তেল ইস্যুতে ভারতের ওপর ৫০০% শুল্কে ট্রাম্পের সায়

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া থেকে তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতসহ কয়েকটি দেশের ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক আরোপের একটি বিলে সম্মতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন কংগ্রেসে শিগগিরই বিলটি উত্থাপিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। তাঁর ভাষায়, এই বিলের লক্ষ্য হলো রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা টিকিয়ে রাখা দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া থেকে অশোধিত তেল আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ তেল তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নয়াদিল্লি তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ মেটাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই আমদানির মাধ্যমে রাশিয়ার অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে এবং ইউক্রেনে সামরিক অভিযানে অর্থায়ন সহজ হচ্ছে। এই যুক্তিতেই ট্রাম্প প্রশাসন ভারতসহ কয়েকটি দেশের ওপর আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিলটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি লেখেন, এই আইনের মাধ্যমে এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, যারা সস্তায় রাশিয়ার তেল কিনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সহায়তা করছে। গ্রাহাম তার পোস্টে স্পষ্ট করে ভারত ছাড়াও ব্রাজিল ও চীনের নাম উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এই দেশগুলো যদি রুশ জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখে, তবে তাদেরও একই ধরনের শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে।

বর্তমানে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে শুল্ক আরোপ করেছে, তা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। রাশিয়া থেকে অশোধিত তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়েছে। এর ফলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের মোট শুল্কহার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রেও রুশ তেল আমদানি বন্ধ করার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে। নয়াদিল্লির জন্য এটি বড় ধরনের কৌশলগত চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শুধু ভারতই নয়, রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপরও সরাসরি আঘাত হেনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। রাশিয়ার দুই প্রধান তেল কোম্পানি রসনেফ্ট ও লুকঅয়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে এসব কোম্পানির সঙ্গে লেনদেনে যুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি বেড়েছে। গত রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “ভারত রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করছে। আমরা খুব শিগগিরই ওদের ওপর আরও বেশি শুল্ক চাপাতে পারি।” এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, ভারতের জন্য সামনে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে।

এই বিলটি যৌথভাবে প্রণয়ন করেছেন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এবং ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল। দ্বিদলীয় এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো রাশিয়ার তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া। একই সঙ্গে এই বিল দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথও খুলে দেবে, যা সরাসরি তৃতীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিলটির সমর্থকরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে পাওয়া বিপুল রাজস্ব বড় ভূমিকা রাখছে। এই আয়ের পথ বন্ধ করতে না পারলে কেবল রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাই যারা রুশ জ্বালানি কিনছে, তাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা জরুরি। এই যুক্তিতেই কঠোর শুল্ক আরোপকে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, এই ধরনের একতরফা শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে এর প্রভাব শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও ধাক্কা লাগতে পারে। ভারতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারাও শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব অনুভব করবেন বলে মত বিশ্লেষকদের।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতিতে বিশ্বাসী। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও তারা রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধন ধরে রাখতে চায়। জ্বালানি নিরাপত্তা ভারতের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর সস্তা রুশ তেল সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে হঠাৎ করে এই আমদানি বন্ধ করা ভারতের জন্য সহজ সিদ্ধান্ত নয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিল কংগ্রেসে পাস হলে ভারতের সামনে তিনটি পথ খোলা থাকবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে রুশ তেল আমদানি কমানো বা বন্ধ করা, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা, কিংবা শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিয়েও বর্তমান নীতি অব্যাহত রাখা। প্রতিটি পথেরই রয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই উদ্যোগের প্রতিক্রিয়াও নজর কাড়ছে। চীন ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর অবস্থান কী হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তারা যদি যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা করে রুশ জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখে, তবে বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিল শুধু রাশিয়ার বিরুদ্ধে নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, রাশিয়া থেকে তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। ভারতের মতো বড় অর্থনীতির ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। কংগ্রেসে বিলটি পাস হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আন্তর্জাতিক মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত